আধিপত্যের দ্বন্দ্বে অশান্ত শিক্ষাঙ্গন - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আধিপত্যের দ্বন্দ্বে অশান্ত শিক্ষাঙ্গন


রিপোর্ট আলোকিত বার্তা:জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী ঘিরে দেশের বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।এসব ঘটনায় শিক্ষক,শিক্ষার্থী,সাংবাদিক ও দুই সংগঠনের নেতাকর্মীসহ অন্তত দেড় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।প্রায় দুই বছর ধরে ক্যাম্পাসগুলোতে যে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ ছিল, সাম্প্রতিক সহিংসতায় তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।এতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে।গত ৩ থেকে ৫ আগস্ট এই তিন দিনে রাজধানীসহ দেশের অন্তত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। গত তিন দিনে সংঘর্ষের ঘটনাগুলোর মধ্যে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই অভ্যুত্থান দিবস’-এর ছবি প্রদর্শনীতে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ ব্যানার টানানোকে কেন্দ্র করে সাতজন আহত হন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রবেশাধিকার ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের আবাসন-সংক্রান্ত দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল পর্যন্ত গড়ায়। এতে অন্তত ৭০ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।এ ছাড়া সরকারি আলিয়া মাদরাসা, ঢাকা কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি বাংলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ও নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজেও বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত সোমবার রাতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে হাসিনার আমলে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের নাম করে দণ্ডিত জামায়াত ও বিএনপির সাবেক নেতাদের ছবি টানানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত সেমিনারে প্রবেশ ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের আবাসন দাবি নিয়ে বাগি¦তণ্ডার জেরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে, যা জবি সংলগ্ন ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের জরুরি বিভাগ পর্যন্ত গড়ায়।একই সময়ে ঢাকা কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদরাসা, সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি বাংলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ এবং নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে সংঘর্ষ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি নোয়াখালীতে গণ-অভ্যুত্থানের আলোচনা সভায় কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতাদের সামনেই হট্টগোল ও বাকযুদ্ধে জড়ান দুই সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা ফিরে আসায় বড় মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন নারী শিক্ষার্থীরা। বিগত আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার পর আবার ক্যাম্পাসে রড, লাঠি, পাইপ ও হেলমেট পরা সশস্ত্র মহড়া দেখে তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী লাইলাতুল জেরিন বলেন, মঙ্গলবার মারামারির পর ক্যাম্পাসে যেতে ভয় লাগছে। হাসপাতালে ঢুকে যেভাবে হামলা করা হয়েছে, তাতে বোঝা যায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কোনো গুরুত্ব তাদের কাছে নেই। তিনি ভেবেছিলেন গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তত ভয়মুক্ত শিক্ষার পরিবেশ পাবেন, কিন্তু আবার সেই পুরনো হেলমেট বাহিনীর মহড়া দেখতে হচ্ছে। বিভিন্ন নারী হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা জানান, রাত নামলেই হলে আতঙ্ক বাড়ে এবং রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের খেসারত দিতে হয় সাধারণ ছাত্রীদের।

শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই সহিংসতার পেছনে তিনটি মূল কারণ কাজ করছে। প্রথমত. ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব ও ইতিহাসের ওপর একক কর্তৃত্ব বা ‘মালিকানা’ দাবির ক্ষেত্রে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে তীব্র দ্বিমত সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয়ত. ২০২৪ পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে (ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু ও জকসু) বিপুল জয় পেয়ে ক্যাম্পাসগুলো এক প্রকার নিয়ন্ত্রণে নেয় ছাত্রশিবির, অন্য দিকে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে জয়ের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে শিক্ষাঙ্গনে নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে ছাত্রদল। তৃতীয়ত. ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত রাজনীতির’ অভিযোগে অভিযুক্ত করছে ছাত্রদল; অন্য দিকে ছাত্রদলকে ‘হল দখলদার ও পেশিশক্তি ব্যবহারকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে ছাত্রশিবির।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে এবং জাতীয় রাজনীতিতে পটপরিবর্তনের পর ছাত্রদল নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। তবে কোনো একক দল যদি মনে করে পেশিশক্তি দিয়ে ক্যাম্পাস চালাবে, তবে সেটি বড় ভুল। বর্তমান সাধারণ শিক্ষার্থীরা আর আগের সেই ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি মেনে নেবে না।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বকে সহিংসতার প্রধান অনুঘটক হিসেবে দায়ী করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধীক শিক্ষক। তারা কঠোর সমালোচনা করে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক আগেই দলীয়করণের কারণে মেরুদণ্ড হারিয়েছে। শিক্ষক ও প্রশাসন নিজেদের দলীয় স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেন। শিক্ষার্থীরা গবেষণাগার, আবাসন সঙ্কট কিংবা শিক্ষার বাজেট বাড়ানোর দাবিতে সোচ্চার না হয়ে কোনো রাজনৈতিক নেতা কী বলল তা নিয়ে মারামারি করছে। এই সহিংসতার আসল ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থীরা ও তাদের অভিভাবকেরা, কারণ নেতাদের সন্তানরা তো দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে না। একই সাথে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা অভিযোগ করেছেন, ক্যাম্পাসগুলোতে সহাবস্থান ধ্বংস করে একক আধিপত্য বিস্তারের এই প্রতিযোগিতায় প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করছে।

সহিংসতার ঘটনায় দুই ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব একে-অপরকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম অভিযোগ করে বলেন, ছাত্রদল অছাত্র ও বড় অপরাধীদের দিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং ছাত্রসংসদগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দেয়া রায় মেনে নিতে না পেরে এই অরাজকতা সৃষ্টি করছে। অন্য দিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির বলেন, ছাত্রশিবির ছাত্রলীগের মতোই হলের সিট ও ক্যাম্পাস এককভাবে দখলের হিংস্র চক্রান্তে মেতেছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধাপরাধীদের ছবি টানিয়ে উসকানি দেয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এখনই কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, সঙ্ঘাত থামাতে হলে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত ভূমিকা পালন করতে হবে, হলে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধে কঠোর হতে হবে এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে সঙ্ঘাতমুক্ত ও নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলাই ছিল শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা। দ্রুত এই অস্থিতিশীলতা রোধ করা না গেলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এক দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Top