ন্যায্য দাম পাচ্ছে না পোশাকখাত
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:সবুজ কারখানা এবং লিড সনদের মতো ব্যয়বহুল ও কঠিন নিয়ম-কানুন মেনেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্য বা বাড়তি দাম পাচ্ছেন না বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা। কারখানার উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম এবং শ্রমিকের মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন না।একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ট্রেসেবিলিটির মতো নতুন নিয়ম চাপিয়ে দিলেও এর বিপরীতে কোনো আর্থিক সহায়তা বা বেশি মূল্য দেয় না। এছাড়া চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে টিকে থাকতে অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে পোশাক বিক্রি করতে হয় রফতানিকারকদের। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো কারখানার ওপর চাপ সৃষ্টি করে অযৌক্তিকভাবে পোশাকের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় সরবরাহকারীদের মধ্যে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ নিচ্ছে বিদেশি ক্রেতারা। এই ধারাবাহিকতায় দেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে বৈশ্বিক মন্দা, ক্রয়াদেশ হ্রাস, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট এবং আমদানি নীতি পরিবর্তনের হুমকির মতো বহুমুখী সংকটে পড়েছে, ফলস্বরূপ অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে এবং রফতানি কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই বহুমাত্রিক সংকটের ফলে দেশের অর্থনীতিতে আরো নাজুক অবস্থায় পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অথচ পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন ফ্যাক্টরি তৈরিতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি খরচ হলেও সাধারণ কারখানার তুলনায় বেশি দাম পাওয়া যায় না।
অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরী পোশাকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং বিদেশি ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোর কম দাম দেয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জোরালো ভূমিকা পালন করে আসছে বিজিএমইএ। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও ব্র্যান্ডগুলো উল্টো পোশাকের দাম কমিয়ে দেয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।তৈরী পোশাক রফতানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোর পোশাকের কম দাম দেয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, মান বজায় রাখতে বিপুল বিনিয়োগ করলেও ব্র্যান্ডগুলো এর উপযুক্ত ন্যায্যমূল্য বা কোনো বাড়তি আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে না। একই সাথে টেকসই শিল্পের স্বার্থে ব্র্যান্ডগুলোর আরো দায়বদ্ধ হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। বিজিএমইএ বর্তমান নেতৃত্ব পোশাক খাতের টেকসই ও বিশ্ববাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে এই নীতিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন মাহমুদ হাসান খান।
সূত্র মতে, গত এক দশকে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ক্ষত কাটিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের ভাবমর্যাদা ফেরাতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বিশ্বের বৃহত্তম পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার হাব গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফাইড কারখানার মধ্যে ৫২টিই বাংলাদেশে। তবে উদ্যোক্তারা দেখছেন, এই ‘সবুজ’ স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বাড়তি দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখছে না।একটি লিড সার্টিফাইড বা পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, কারখানার আকার ও মানভেদে এমন একটি আধুনিক কারখানা গড়তে ৮০ লাখ থেকে এক কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। সাধারণ কারখানার তুলনায় এর নির্মাণ খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। এই বাড়তি অর্থ মূলত ব্যয় হয় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ভবন নকশা, পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ভেন্টিলেশন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পেছনে।
বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারকদের প্রত্যাশা ছিল, এই বিশাল বিনিয়োগ ক্রেতাদের আস্থা বাড়াবে এবং বিশ্ববাজারে তারা প্রতিযোগিতামূলক ও ভালো দাম পাবেন। তবে সেই প্রত্যাশা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, লিড বর্তমানে বাণিজ্যিক সুবিধার চেয়ে একটি ‘মার্কেটিং গিমিক’ বা বিপণন কৌশলে পরিণত হয়েছে। একটি কারখানা কেবল লিড সার্টিফাইড বলেই ক্রেতারা এক পয়সাও বাড়তি দাম দিতে রাজি হয় না। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের তুলনায় আমরাই লিড সনদকে অনেক বেশি বাণিজ্যিক গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছি।
বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ২৮৪টি লিড সার্টিফাইড পোশাক কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ১২১টি প্ল্যাটিনাম এবং ১৪৪টি গোল্ড রেটেড। এই বিশাল অর্জন রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর বিশ্ববাসীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং দেশকে টেকসই উৎপাদনের বিশ্বনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভাবমর্যাদা ফিরলেও আসেনি ‘প্রিমিয়াম’ দাম
অনেক উদ্যোক্তার কাছেই ‘সবুজ’ বা পরিবেশবান্ধব হওয়ার লক্ষ্যটি কেবল তাৎক্ষণিক আর্থিক মুনাফা ছিল না। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, রানা প্লাজার পর শিল্পের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমর্যাদা ফিরিয়ে আনা এবং আমাদের কারখানাগুলো যে বিশ্বমানের তা প্রমাণ করা। সেই লক্ষ্য অনেকাংশেই অর্জিত হয়েছে।
.তবে বাণিজ্যিক দিক থেকে চিত্রটি ভিন্ন। ফজলুল হকের মতে, পরিবেশবান্ধব কারখানার কারণে বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে পৌঁছানো সহজ হয়েছে এবং ক্রেতাদের সাথে সম্পর্কের পরিধি বেড়েছে। কিন্তু কারখানা নির্মাণে যে বিপুল বাড়তি বিনিয়োগ হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে ব্র্যান্ডগুলো কোনো বাড়তি দাম বা আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, আমাদের সুযোগ বেড়েছে; কিন্তু আর্থিক প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ক্রেতারা অর্গানিক কটনের মতো পণ্যের জন্য সানন্দে বাড়তি দাম দিলেও পরিবেশবান্ধব কারখানার মালিকদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো স্বীকৃতি বা প্রিমিয়াম দিচ্ছে না। এটি ছিল মূলত উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগ, ক্রেতারা আমাদের গ্রিন ফ্যাক্টরি করতে বাধ্য করেনি।
বিনিয়োগের সুফল কেবল পণ্যের দামে নয়
তবে সবাই কেবল পণ্যের বাড়তি দাম দিয়ে লিড সনদের মূল্যায়ন করার পক্ষে নন। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, উদ্যোক্তাদের উচিত বিদ্যুৎ, পানি এবং পরিচালন ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয় দিয়ে এই বিনিয়োগের সার্থকতা বিচার করা। তিনি বলেন, লিড সার্টিফাইড কারখানাগুলো সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং এমন কর্মপরিবেশ তৈরি করে যেখানে তাপের চাপ কম থাকে। একই সঙ্গে লিড নেয়া একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কোনো ক্রেতা কাউকে এটি নিতে বাধ্য করে না। যদি জ্বালানি ও পানির সাশ্রয় এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিনিয়োগ উঠে আসে, তবেই একজন প্রস্তুতকারকের জন্য এটি লাভজনক হবে।
ক্রেতাদের নজর এখন লিড সনদের বাইরে
কিছু কারখানা মালিকের মতে, বৈশ্বিক টেকসই উৎপাদনের আলোচনা এখন কেবল পরিবেশবান্ধব ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শোভন ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন সনদের চেয়ে নিয়মিতভাবে যাচাইযোগ্য পারফরম্যান্স বা কর্মক্ষমতার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন।
তিনি ‘হিগ ইনডেক্স’-এর উদাহরণ টেনে বলেন, ক্রেতারা এখন জ্বালানি ব্যবহার, পানি সাশ্রয় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্বাধীন ও প্রকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সরবরাহকারীদের মূল্যায়ন করেন। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন আইন অনুযায়ী সাপ্লাই চেইনের স্বচ্ছতা এবং টেকসই উৎপাদনের প্রমাণের গুরুত্ব বাড়ছে।শোভন ইসলাম বলেন, লিড সনদ এখন আর ক্রেতাদের আবশ্যিক শর্ত নয়। বর্তমানে ক্রেতারা যাচাইকৃত তথ্য চান। তারা দেখতে চান আপনি কতটা বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করছেন এবং আপনার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেমন। ইন্ডাস্ট্রি এখন সেদিকেই যাচ্ছে। তার মতে, ইয়াংওয়ানের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লিড সনদ ছাড়াও বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী সুনাম বজায় রেখেছে, কারণ তাদের কাজের গুণগত মানই মূল পরিচয়।
দেশে পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রফতানি ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি নেয়ার এই সময়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এদিকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো কারখানার ওপর চাপ সৃষ্টি করে অযৌক্তিকভাবে পোশাকের দাম কমিয়ে দিলেও দেশেও নানাবিধ সমস্যায় এই খাতটি। শিল্প মালিকরা বলছেন, বর্তমানে দেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্যাসের তীব্র সংকট। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় দিনের দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানাকে উৎপাদনের সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও শিফট কমাতে হচ্ছে, আবার কিছু কারখানায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উৎপাদন স্থগিত রাখার ঘটনাও ঘটছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে উঠছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার ওঠানামাও বাংলাদেশের রফতানি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিজিএমইএর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু বাজার পরিস্থিতির উন্নতি যথেষ্ট নয়। শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সময়োপযোগী নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, পোশাক খাত শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি তা নয়; দেশেও নানাবিধভাবে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। পোশাক শিল্প অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান করা এখন শুধু উৎপাদনের প্রশ্ন নয়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকারও পূর্বশর্ত।