জলবায়ু পরিবর্তন রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলবায়ু পরিবর্তন রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে


জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:বাংলাদেশের বড় বড় শহরের মানুষ বছরে ৭২ থেকে ৮৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুম হারিয়েছেন। সত্তর দশকের তুলনায় এই ঘুমের ক্ষতি অন্তত দ্বিগুণ হয়েছে। ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় জনস্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা বড় ঝুঁকিতে পড়েছে।আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রালের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ইজ কস্টিং পিপল স্লিপ (জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষ ঘুম হারাচ্ছে)’ শিরোনামের দিনে তপ্ত রোদ সয়ে একটু শীতলতার জন্য রাতের অপেক্ষায় থাকে মানুষ। কিন্তু এখন সেই স্বস্তিও মিলছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাতের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের ঘুমের ওপর। উষ্ণ হয়ে ওঠা রাত ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে এতদিন আলোচনায় ছিল তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়। এবার সামনে এলো ঘুম কেড়ে নেওয়ার মতো ভিন্ন এক চিত্র।বিশ্বের এক হাজার ৩৩৮টি বড় শহরের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করেছে ক্লাইমেট সেন্ট্রাল। এতে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত ঘুমের ক্ষতির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকায় গত পাঁচ দশকে নাটকীয় বাঁকবদল হয়েছে। এর প্রভাব শুধু মানুষের বিশ্রামে সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা, অর্থনীতি ও জীবনমানের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘুম হারাচ্ছেন চট্টগ্রামের মানুষ। সেখানে বছরে গড়ে ৮৪ ঘণ্টা ঘুম কমে গেছে। এর পর রয়েছে খুলনা ৭৯ ঘণ্টা, ঢাকা ও রাজশাহী ৭৬ ঘণ্টা, গাজীপুর ও কুমিল্লা ৭৪ ঘণ্টা এবং রংপুর ৭২ ঘণ্টা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার চিত্রও উদ্বেগজনক। মিরপুর ও পল্লবীর বাসিন্দারা বছরে প্রায় ৭৭ ঘণ্টা এবং মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা ৭৩ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুম হারাচ্ছেন।বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ঢাকা ও রাজশাহীতে তাপমাত্রাজনিত ঘুমের ক্ষতির মাত্র ৩ শতাংশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী ছিল। ২০২০ থেকে ২০২৫ সময়ে তা বেড়ে ৬ শতাংশে পৌঁছে, অর্থাৎ ১০০ শতাংশ বেড়েছে। কুমিল্লা ও রংপুরে এই হার ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ শতাংশ হয়েছে, যা পাঁচ দশকে ১৩০ শতাংশেরও বেশি।

বাংলাদেশের এই চিত্র বৈশ্বিক প্রবণতারই প্রতিফলন। বিশ্বের এক হাজার ৩৩৮টি বড় শহরে তাপমাত্রাজনিত ঘুমের ক্ষতি ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সময়ে জনপ্রতি বছরে ৪৫ দশমিক ৬ ঘণ্টা ছিল। ২০২০ থেকে ২০২৫ সময়ে তা বেড়ে ৪৯ দশমিক ৯ ঘণ্টায় পৌঁছেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ঘুমের ক্ষতি আরও দ্রুত বেড়েছে। এটি ১ দশমিক ৭ ঘণ্টা থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ১ ঘণ্টায় পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রায় তিন গুণ। ফলে মোট ঘুমের ক্ষতির মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের অবদান ৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনটি বলছে, এটি প্রথম বৈশ্বিক বিশ্লেষণ যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘুমের ক্ষতির পরিমাণ মাপা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিশ্বের এক হাজার ৩৩৮টি শহরের মধ্যে এক হাজার ৩৩৫টিতেই সত্তর দশকের চেয়ে তাপমাত্রাজনিত ঘুমের ক্ষতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা অন্তত দ্বিগুণ হয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, রাতে তাপমাত্রা বেশি থাকলে শরীর দিনের স্বাভাবিক তাপ থেকে সরতে পারে না। শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা না কমায় ঘুম আসতে দেরি হয়, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় এবং গভীর ঘুমের সময়ও কমে আসে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, স্মৃতিশক্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দ্রুত নগরায়ণ, কংক্রিটের বিস্তার, শহরে তাপদ্বীপ (আরবান হিট আইল্যান্ড) প্রভাব এবং শীতলীকরণ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের শহরগুলোতে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, উষ্ণ রাতের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। শীতলীকরণ ব্যবস্থার সীমিত সুযোগের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ঘুমের ব্যাঘাত ও এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব বেশি ভোগ করে। এমনকি যেসব পরিবারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে, সেখানেও রাতের বাড়তি তাপমাত্রা ঘুমের মান কমিয়ে দেয়।গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্সের চেয়ারম্যান এবং কানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট ডা. কোর্টনি হাওয়ার্ড বলেন, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণ রাতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ঘুমের ব্যাঘাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। তাই অভিযোজন ব্যবস্থার পাশাপাশি দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো জরুরি।

প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় রাতের অতিরিক্ত তাপমাত্রার ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য শীতলীকরণ সুবিধা বাড়ানো, নগর পরিকল্পনায় তাপদ্বীপ প্রভাব কমানো, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা জোরদার করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার নতুন এই গবেষণার বিষয়ে বলেন, শুধু দিনের বেলায় রোদের হাত থেকে বাঁচলে চলবে না, রাতের তাপমাত্রার দিকেও নজর দিতে হবে। উষ্ণ রাতের কারণে কমে যাওয়া ঘুম ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য তাপদাহ মোকাবিলায় জাতীয় পরিকল্পনা (হিট-অ্যাকশন প্ল্যান), আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং শহরগুলোকে গাছপালা বা জলাশয় দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখার (আরবান কুলিং) বিকল্প নেই। এসব পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই এই তাপপ্রবাহ মানবসভ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

Top