সরকারকে চাপে ফেলে ফের নৈরাজ্য
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:সরকারকে চাপে ফেলে সয়াবিন তেলের দাম আরেক ধাপ বাড়াতে পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরির চক্রান্ত করেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকার পরও তারা মিলপর্যায়ে সরবরাহ কমানোর তোড়জোড় শুরু করেছে।এ পরিস্থিতিতে সরকার দাম না বাড়ালেও চক্রের কারসাজিতে খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিন মাসের ব্যবধানে লিটারে ৬টা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিক্রি হচ্ছে ১৯৮ টাকায়। যা সরকার নির্ধারিত মূলের ১৮ টাকা বেশি। ইতোমধ্যে ডিলার পর্যায়ে এই তথ্য জানিয়ে দিয়েছে সিন্ডিকেট চক্র। পরিকল্পনার আওতায় ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ৮ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৩ টাকা বাড়াতে সরকারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও দেওয়া হয়েছে চিঠি।
এ বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দেশের ৪ থেকে ৫টি বড় কোম্পানি সয়াবিন তেলের বাজারের ৮৫-৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। বাকি ১০-১৫ শতাংশ অন্য ছোট কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে। ওইসব বড় কোম্পানি দেশের চাহিদামতো তেল আমদানির পর রিফাইন করে বাজারে ছাড়ে। বাড়তি মুনাফা করতে তারা বছরের একেক সময় তাদের ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। সরকারকে চাপে ফেলে সাধারণ ভোক্তাকে জিম্মি করে মূল্য বাড়িয়ে নেয়। গত কয়েক বছর একই পন্থায় ওই চক্র সরকারকে চাপে ফেলে মূল্য বাড়িয়ে নিয়েছে। তবুও ওই চক্র নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাজারে প্রায় ৫-১০ টাকা বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রি করে। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয়ের কারণ দেখিয়ে ১১ জুলাই ভোজ্যতেলে লিটারে ৮-১০ টাকা বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। এ অবস্থায় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম খুচরা বাজারে ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়িয়ে ৫ লিটারের বোতল এক হাজার ১৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিনের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৮৮ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। একইভাবে খোলা পাম তেলের দামও লিটারে ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, দাম না বাড়ালে টানা লোকসান দিয়ে এভাবে আমদানি করে বাজারজাত সম্ভব হবে না। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। চিঠি দেওয়ার সপ্তাহ পর একদফা বৈঠকও হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। তবে কোনো মীমাংসা ছাড়াই শেষ হয় বৈঠক। ফের বৈঠক করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে দাম বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাওরান বাজারের একটি সয়াবিন তেল ব্র্যান্ডের ডিলার জানান, ফের তেলের দাম বাড়াতে চায় কোম্পানিগুলো। সে কারণে সরকারকে চিঠি দিয়েছে। দাম না বাড়ালে ডিলার পর্যায়ে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেবে বলে জানিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের কাছে সরবরাহ যতক্ষণ থাকে আমরা খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ করি। কোম্পানি তেল না দিলে আমরা খুচরায় দিতে পারি না। এমন পরিস্থিতি গত কয়েকবার হয়েছে।
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। এখন বিশ্ববাজারে টনপ্রতি অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এক হাজার ১৯১ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছে। মাসখানেক আগে যা ছিল এক হাজার ১৬৯ মার্কিন ডলার। এক বছর আগে এই দাম ছিল এক হাজার ৭৮ ডলার। একইভাবে বেড়েছে পাম তেলের দামও। বর্তমানে প্রতি টন অপরিশোধিত পাম তেল বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ১৬২ ডলার। এক মাস আগে যা ছিল এক হাজার ১৪৫ ডলার এবং এক বছর আগে বিক্রি হয়েছে এক হাজার ২৫ ডলারে। তাই দেশের বাজারে মূল্য সমন্বয় না করলে ব্যবসা করে টিকে থাকা যাবে না।
টিকে গ্রুপ সূত্র জানায়, আমাদের আমদানি পর্যায়ে সব খরচ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে পরিবহণ খরচও। এসব কারণে বর্তমান বাজারদরের তুলনায় লিটারে ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে। এতে লোকসান হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত দামের সঙ্গে তারতম্য রয়েছে। কারণ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপণ্যে একগুচ্ছ কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। সেসব সমন্বয় করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া প্রায় তিন মাস আগে (২৯ এপ্রিল) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪ টাকা বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছিল।
প্রসঙ্গত, এপ্রিলের প্রথম দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল মিল মালিকদের অ্যাসোসিয়েশন। সেখানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়, যা ওই সময় সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৯৫ টাকা। এছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়, যা তখন বর্তমানে ৯৫৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়। ওই সময় সরকারকে বৃদ্ধঙ্গুলি দেখিয়ে সিন্ডিকেট চক্র বাড়তি মূল্য সরকারের অনুমতি পাওয়ার আগেই কার্যকরের ঘোষণা দেয়। ওই সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে ১২ এপ্রিল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বৈঠকে তিনি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কোনোভাবেই দাম না বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপও করেন। পাশাপাশি কঠোর পদক্ষেপের কথা জানান। তবে তখন বৈঠকের ১১ দিনেও বাজারে সয়াবিন তেল সরবরাহ বাড়েনি। মন্ত্রী কড়া অবস্থানে থাকলেও ওই সিন্ডিকেট বাজারে তেল সরবরাহ কমিয়ে দেয়। মুদি দোকান থেকে দিনে ২০ কার্টনের চাহিদা দিলেও সরবরাহ করা হয় দুই থেকে চার কার্টন। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদা বাড়ায় সুযোগ বুঝে খোলা সয়াবিনের দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি হয়। এতে ওই সময় বিপাকে পড়েন সব শ্রেণির ক্রেতা।
পরিস্থিতি ফের সামাল দিতে ২৯ এপ্রিল বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার টাকা বাড়ায় সরকার। সেদিন সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ভোজ্যতেলের মূল্য পর্যালোচনাসংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেন। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতি লিটারের দাম ১৯৫ টাকা থেকে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।