বাস ও কার চালকের ভুলে ঝরল ১৮ প্রাণ,গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেও বেপরোয়া
রিপোর্ট আলোকিত বার্তা:যাত্রীবাহী বাস ও প্রাইভেটকার চালকদের বেপরোয়া আচরণ ও ভুলে সিলেটে ৯ জন এবং বগুড়ায় পৃথক ঘটনায় ৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।শুক্রবার সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে সঙ্গীতশিল্পী ও শিশুসহ ৯ জন নিহত হয়। এ ঘটনায় আরও ১৫ জন আহত হয়। একই দিন বগুড়া সদরের এরুলিয়ায় বাসচাপায় সাত দিনমজুর নিহত হয়। এ সময় ১৫ জন আহত হয়। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে চালকরা উচ্চ গতিতে বাস চালানোয় এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোয় এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
এছাড়া একইস্থানে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দম্পতি নিহত হয়। এ সময় তাদের নাতি আহত হয়। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
সিলেট ও ওসমানীনগর : সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহণের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল স্লিপার কোচের একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে সাতজন নিহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর শিশুসহ দুজনের মৃত্যু হয়। এ সময় আহত ১৫ জনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
নিহতরা হলেন-সিলেট নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম (২২) ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার চন্ডীপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর শেখের কন্যাশিশু জাইফা (৩), কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার চণ্ডীবের গ্রামের কালু মিয়ার মেয়ে বাউলশিল্পী ইশরাত জাহান পেহেলী ভৈরবী (১৭), ফারুক মিয়া (৫০) ও কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরীনা লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাফিউদ্দিনের ছেলে হাজী সাইফুল ইসলাম (৫০), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাইফুল ইসলাম ইমন (৩০) ও নবীনগর উপজেলার বারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৪৬), কুমিল্লার লাকসামের রফিকুল ইসলামের ছেলে আরমান হোসেন রাহিম (১৯), সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯)। আহতদের মধ্যে রয়েছেন-ঢাকার মুক্তার মিয়া, মন্ডু দাস, মনসুর আলী ও নুরুন্নাহার, যশোরের ওয়াহাব মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আতিকুল ও মফিজ, ফরিদপুরের শামীম, সুনামগঞ্জের রাজু দাস, কুমিল্লার ইমরান ও কিশোরগঞ্জের বাবুল।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। উদ্ধার অভিযান প্রসঙ্গে ওসমানীনগর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার অপু মিয়া জানান, খবর পেয়ে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত বাস দুটি সরিয়ে নেওয়ার পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
হতাহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে তাৎক্ষণিক অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। শেরপুর হাইওয়ে থানার ওসি আনিসুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মোস্তফা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বাস দুটি জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে-উচ্চ গতিতে চলায় এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোয় দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বগুড়া : সদরের এরুলিয়ার সিল্কিবান্ধা এলাকায় শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বাসচাপায় ঘটনাস্থলেই তিন দিনমজুর নিহত হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর আও চারজন মারা যান। এ সময় ১৫ জন আহত হন।
নিহতরা হলেন-বগুড়া সদরের ফাঁপোড় মধ্যপাড়ার ইব্রাহীম আলীর ছেলে বেল্লাল হোসেন (৩৭), কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদারপাড়ার নজের হোসেনের ছেলে নূর মোহাম্মদ সরদার (৭৫), দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার দুঘোলগাছী গ্রামের গোলাপ শাহের ছেলে তাজিমুল শাহ্ (৪৭), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের আবু সিদ্দিকের ছেলে আবু সাঈদ (৪৫), একই উপজেলার বহিলগ্রামের ফয়জার রহমানের ছেলে নূর আলম (৪৫), জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পার্বতীপুর গ্রামের খায়বর আলীর ছেলে আনারুল ইসলাম (৫৫) এবং পাঁচবিবি উপজেলার আমিরপুর গ্রামের জালাল উদ্দিনের ছেলে আমিরুল ইসলাম (৪০)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঢাকা ছেড়ে আসা নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহণের একটি বাসের চালক গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এরপর বাসটি ঘুরে যায় এবং বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের বিদ্যুতের খুঁটিতে বাসটি আঘাত করে। কাজের সন্ধানে আসা দিনমজুররা সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। বাসের চাপায় ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হন। ১৯ জন আহত হন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে পাঠায়। হাসপাতালে চারজন মারা যান। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
দুর্ঘটনার পরপরই বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াজেদ হোসেন, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। হাসপাতালে গিয়ে জেলা প্রশাসক আহতদের চিকিৎসার ব্যাপারে তদারকি ও ফেসবুকে রক্ত চেয়ে অনুরোধ জানান। নিহতদের পরিবারকে তিনি নগদ ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, দুর্ঘটনার পর গতিনিরোধক নির্মাণের দাবিতে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও শ্রমিকরা প্রায় চার ঘণ্টা বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। এ সময় উভয়পাশে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। এরুলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আতিক জানান, সিল্কিবান্ধা এলাকায় মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। তাই এখানে গতিরোধক থাকা প্রয়োজন। ঘটনাস্থলে গতিরোধক নির্মাণের দাবিতে এলাকাবাসী সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় চার ঘণ্টা পর সকাল ১০টার দিকে প্রশাসন গতিরোধক নির্মাণ শুরু করলে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
কারের ধাক্কায় বাইক আরোহী দম্পতি নিহত : বগুড়া সদরের এরুলিয়া এলাকায় শুক্রবার বিকালে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী স্বামী ও স্ত্রী নিহত হয়েছেন। এ সময় তাদের আট বছরের নাতি আহত হয়েছে। নিহতরা হলেন-বগুড়া মহানগরীর আটাপাড়া এলাকার মোসলেম উদ্দিনের ছেলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী বাবুল হাসান (৫৫) ও তার স্ত্রী জেসমিন বিবি (৪৭)। আহত শিশু জুলকারনাইন (৮) বাবুলের বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজার সন্তান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ব্যবসায়ী বাবুল হাসান স্ত্রী জেসমিন বিবি ও নাতি জুলকারনাইনকে নিয়ে মোটরসাইকেলে কাহালু উপজেলায় বড় ছেলের বাড়িতে দাওয়াতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে এরুলিয়া বিমানবন্দর এলাকায় বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিপরীত দিক থেকে আসা প্রাইভেটকারের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেন। এতে মোটরসাইকেলটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই বাবুল হাসান নিহত হন। স্থানীয়রা জেসমিন ও জুলকারনাইনকে উদ্ধার করে শজিমেক হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা জেসমিনকে মৃত ঘোষণা করেন। জুলকারনাইন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।বগুড়া সদর থানার এসআই মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের জন্য লাশ দুটি শজিমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেটকারটি জব্দ করা হয়েছে। তবে এর চালক পালিয়ে গেছেন।