চাই রাজনীতিমুক্ত সচেতনতা - Alokitobarta
আজ : শুক্রবার, ২৮শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফের জানাযায় মাওলানা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের অংশগ্রহণ বই ছাপায় সিন্ডিকেট,আওয়ামী লীগ নেতা রাব্বানীর একক দরপত্র, সরকারের বাড়তি খরচ ৩ কোটি টাকা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবি অর্থায়ন করতে আগ্রহী,গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেল ব্যয় ৬১ হাজার কোটি টাকা অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৃণমূলের দায়িত্বশীলদের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে ওয়াশরুমের ফলস ছাদে লুকিয়ে পুলিশকে গুলি,মোবারকসহ গ্রেফতার ৪,পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত , লুট হওয়া অস্ত্র-গু... ফ্যামিলি কার্ডে নতুন হিসাব ৪১ লাখ কার্ড বানাতেই ব্যয় ২৪৬ কোটি টাকা শেষ মুহূর্তে বিরোধী দলের ওয়াকআউট,সংসদে তিন বিল উত্থাপন ফের আলোচনায় ভারতের হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন,বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার অপপ্রচার ঠেকাতে এমপিদের মাঠে থাকার নির্দেশ,

চাই রাজনীতিমুক্ত সচেতনতা


সৈয়দ মেহেদী হাসান:মানুষ ও পশুদের মধ্যে পার্থক্য কি? মাধ্যমিকের সমাজবিজ্ঞান পড়ানোর সময় ক্লাশ শিক্ষক বেশ জোড়ালোভাবে আলোকপাত করতেন। তখন বুঝতে শিখলাম-আর যা বলি মানুষ পশুদের কাছ থেকে আলাদা হয়েছে তার মানবিক গুনাবলি দিয়ে। তার মধ্যে দয়া, পরম্পরা, সৌহার্দ্য দিয়ে। অভূক্তের মুখে খাবার তুলে দিয়ে, নির্যাতিতর পাশে দাঁড়িয়ে, অসুস্থ্যকে সেবা করে সুস্থ্য করে তুলে।

প্রাগৌতিহাসিক যুগের ইতিহাস দেখলে অনায়াসে জানবেন মানুষের এই মানবিক যুদ্ধটা ছিল হিংস্র পশুদের বিরুদ্ধে। পশুদের পরাজিত করে সমাজ নির্মাণ করে মানুষ। সেই সমাজ আবার অগ্রবর্তীদের শাণিত চিন্তায় হয়ে উঠছে আধুনিক। এর পর সমাজের যাত্রা কোনদিকে?উত্তরাধুনিক বা পুরাধুনিক বলতে সাম্প্রতিক কিছু শব্দ শোনা যায়। শব্দগুলো জনপ্রিয়ওবটে। কিন্তু সমাজের গতি দেখে মনে হয় না এই দুটি শব্দ কখনো সঠিক সমাজের সমার্থক হতে পারে। তবে এটা মেনে নেওয়া যায় বাংলাদেশে এখন উত্তরাধুনিক বা পুরাধুনিক কোন সমাজ ব্যবস্থাই নয় পুর্নবাসিত হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়। আগে মেধাবীরা নেতা হতেন; এখন মেধালোপাটকারীরা নেতা হন। একসময়ে সম্মানিত পেশা ছিল শিক্ষকতা; এখন অল্প পুঁজিতে বেশি আয়ের পেশা শিক্ষকতা। তরুণ সমাজকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো জাতি; বর্তমানে হতাশার কেন্দ্রবিন্দুতে তরুণরা।তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়? এমন নষ্ট, কুলাংগার, চরিত্রহীন-পশুত্ববাদী সমাজ কি চেয়েছিল জাতি? কয়েকটি চিত্র নিশ্চয়ই ভোলার নয়। বরগুনায় প্রকাশ্যে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা, নেপথ্যে অভিযুক্ত হলেন হত্যাকারীদের নিবৃতকারী স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। কুমিল্লায় বিচার চলাকালীন এজলাসে একজনকে কুপিয়ে খুন করলো আরেকজন। গুজবে মানুষ পিটিয়ে খুন করা, ধর্মীয় লেভাস গায়ে জড়িয়ে ট্রাম্পের কাছে শুধুমাত্র নিজের অভিবাসন পাকাপোক্ত করার জন্য জন্মভূমি সর্ম্পকে বেঈমান প্রিয়া সাহার মিথ্যাচার। রাষ্ট্রের চাকর কথিত এক ভিআইপির কারণে তিন ঘন্টা ফেরী আটকে রেখে কিশোর তিতাসকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। খুলনায় ওসির নেতৃত্বে নারীকে ধর্ষণ-কি আমাদের নাড়া দেয়? আর প্রতিদিন দেশে ঝাঁকে ঝাঁকে লাশ উদ্ধার করছে পুলিশ আর ধর্ষিতার পরীক্ষা হাসপাতালে চলছে দেদার।

মানুষ আসলে এখন কার সাথে যুদ্ধ করে উত্তরাধুনিক বা পুরাধুনিক সমাজ বিনির্মাণের চেষ্টা চালাচ্ছে সেটা কেউ জানে না। তবে এটা স্পষ্ট যে মানুষ মানুষের সাথেই যুদ্ধ করছে। তার মানে সমাজে কিছু মানুষ আছে, কিছু পশুতে পরিণত হয়ে গেছে। এই অর্ধেক পশু; অর্ধেক মানুষ সমাজের চালচিত্র সেকারণেই নর্দমার মত। এই সমাজের কোন চরিত্র নেই। আমাদের এমন চরিত্রহীনতার কারণ কি? সবাইতো বলছে উন্নয়নের মহাসড়কে দৌড়ালেও এখনো বাঙালী গুজবপ্রিয় মানুষ। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখে করেছেন, দেশে স্বাধীনতা আছে বিধায় তার বিরুদ্ধে অপ্রপ্রচার চালাতে পারছে বিরোধীরা। অপপ্রচার বা গুজব বাংলাদেশে এখন সমার্থক শব্দ। বস্তুত গুজব কি?

গুজব হল আমেরিকান ইংরেজিতে rumor বা ব্রিটিশ ইংরেজিতে rumour ; অর্থ হল, জনসাধারণের সম্পর্কিত যেকোন বিষয়, ঘটনা বা ব্যক্তি নিয়ে মুখে মুখে প্রচারিত কোন বর্ণনা বা গল্প। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায়, গুজব হল এমন কোন বিবৃতি যার সত্যতা অল্প সময়ের মধ্যে অথবা কখনই নিশ্চত করা সম্ভব হয় না। অনেক পন্ডিতের মতে, গুজব হল প্রচারণার একটি উপসেট মাত্র। সমাজবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞান শাস্ত্রে গুজবের ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা পাওয়া যায়। গুজব অনেক ক্ষেত্রে ‘ভুল তথ্য’ এবং ‘অসঙ্গত তথ্য’ এই দুই বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ‘ভুল তথ্য’ বলতে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যকে বুঝায় এবং ‘অসঙ্গতি তথ্য’ বলতে বুঝায় ইচছাকৃতভাবে ভ্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা। রাজনীতিতে গুজব বরাবর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে ইতিবাচক গুজবের পরিবর্তে নেতিবাচক গুজব সর্বদা অধিক কার্যকর হতে দেখা গেছে।

আমি মায়ের মুখে প্রথম শুনেছি হুজুগে বা গুজবে বাঙালী শব্দটি। তখন বুঝতাম না-হুজুগ আসলে কি জিনিস। পরে যখন বুঝলাম তখন আবার বুঝতাম না হুজুগে উপসর্গটি মা বাঙালীদের দিয়ে আমাকে বুঝায় কেন? তবে এখন বুঝতেছি বাঙালী কতটা অর্থব হুজুগকে বিশ্বাস করে। যার প্রমাণ চারদিকে কল্লাকাটা আর ছেলেধরা গুজবে প্রতিবন্দী, মানসিক ভারসাম্যহীন, ভিক্ষুক, নারী, অসহায়দের পিটিয়ে খুন করছে। শত শত মানুষ আবার সেসব দেখে উল্লাস প্রকাশ করছে। যেহেতু বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ-সেই ইসলামেও কিন্তু অনুমান বা গুজবে কিছু করাটা শরিয়াহ পরিপন্থি। আমার মতে চোর, খুনি, ধর্ষকদের কাছে ধর্মের দোহাই কাজে আসে না। ফলে নামি মুসলমান/হিন্দুরাও কিন্তু অনুমানের ওপর ছেলেধরা/কল্লাকাটা ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলছে।

আমরা গুজব বিশ্বাস করতে শুরু করলাম কেন? উত্তরটাও সহজ। বিগত দিনে আমাদের গুজব/একই মিথ্যা গল্প বারবার চেপে ধরে বিশ্বাস করাতে বাধ্য করানো হয়েছে-হচ্ছে। যেহেতু মানুষ সত্যতাহীন গল্প বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। ফলে ছেলেধরা গুজবের প্রচলনতো অনেক পুরানো; ফলে পুরান বোতলে নতুন মদ ঢাললে পাবলিকতো মজা-মাস্তি করে লুফে নিবে। আমরা সেইসব বিষাক্ত চর্চার ফল এই গণপিটুনির মধ্য থেকে পাচ্ছি।

নির্বাচন,ক্রসফায়ার,বড় ধরণের দুর্ঘটনায় দায়িত্বশীলদের কান্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য বারবার আমাদের বিশ্বাস করতে হয়েছে। ধরুণ নয়ন বন্ডের কথা। তাকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা যেত। কিন্তু বাস্তবে এই খুনি গেল ক্রসফায়ারে। এখানে মানুষ শিখলো বিচার ব্যবস্থার নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা। এই ক্রসফায়ারের গল্প কিন্তু পুরানো এবং একই কাঠামোর। শুধু প্রত্যেক ফায়ারে চরিত্র বদলায়। বিচার ব্যবস্থা চালু থাকার পরও যখন বিচারহীনতায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তখন জনগণও উদ্বুদ্ধ হয়ে আইন হাতে তুলে নিতে সাহস করছে। অর্থাৎ মানুষ মিথ্যাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

এমন মিথ্যা মিথ্যা খেলা সমাজের জন্য সুখকর কোন সংকেত নয়। এসব মানুষকে পশুতে পরিণত করতে পারে কিন্তু পশু চরিত্রকে মানবিক করতে পারে না। সে কারণে কারও মুখাপেক্ষি না হয়ে বিবেক দিয়ে সমস্যার রক্তপাতহীন সমাধান করা উচিত। যেহেতু বাংলাদেশের মালিক জনগণ। রাজা আসবে রাজা যাবে-ফলে কে কি করলো সে দিকে না তাকিয়ে নিজের মালিকানাধীন দেশের প্রতিটি মানুষের উচিত সমাজের শান্তি বজায় রাখতে যার যার অবস্থান থেকে সহনশীলতার সাথে সিদ্ধান্ত নেওয়া। একজন সন্তান জন্মনিতে মায়ের পেটেই সময় নেন দশ মাস দশ দিন। কিন্তু মানুষ মেরে ফেলতে দশ মাস দশদিন সময় লাগে না। অর্থাৎ দেশের স্বাধীনতা, সহমর্মিতা ও সহাবস্থান তৈরীতে বছরের পর বছর পদক্ষেপ দরকার। এসব ধ্বংস করতে কিন্তু একদিনও সময় লাগে না। ফলে একটি সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার জন্য দরকার রাজনীতিমুক্ত সচেতনতা।
লেখক : সভাপতি, নিউজ এডিটরস কাউন্সিল, বরিশাল।

Top