ফের আলোচনায় ভারতের হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন,বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার - Alokitobarta
আজ : শুক্রবার, ২৮শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফের জানাযায় মাওলানা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের অংশগ্রহণ বই ছাপায় সিন্ডিকেট,আওয়ামী লীগ নেতা রাব্বানীর একক দরপত্র, সরকারের বাড়তি খরচ ৩ কোটি টাকা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবি অর্থায়ন করতে আগ্রহী,গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেল ব্যয় ৬১ হাজার কোটি টাকা অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৃণমূলের দায়িত্বশীলদের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে ওয়াশরুমের ফলস ছাদে লুকিয়ে পুলিশকে গুলি,মোবারকসহ গ্রেফতার ৪,পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত , লুট হওয়া অস্ত্র-গু... ফ্যামিলি কার্ডে নতুন হিসাব ৪১ লাখ কার্ড বানাতেই ব্যয় ২৪৬ কোটি টাকা শেষ মুহূর্তে বিরোধী দলের ওয়াকআউট,সংসদে তিন বিল উত্থাপন ফের আলোচনায় ভারতের হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন,বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার অপপ্রচার ঠেকাতে এমপিদের মাঠে থাকার নির্দেশ,

ফের আলোচনায় ভারতের হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন,বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার


মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন: ভারতের আসাম রাজ্যের বরনগর থেকে বিহারের কাটিহার পর্যন্ত ৭৬৫ কেভি হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণে বাংলাদেশের ভূমি (করিডর) ব্যবহার নিয়ে আবার আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে।ভারত সরকারের তাগাদার পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগ এ ব্যাপারে বেশকিছু কাগজপত্র তৈরি করেছে।সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ভারতকে চারটি শর্ত দেওয়ার চিন্তা করছে।এগুলো পালন করলে ওই হাইভোল্টেজ সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে বাংলাদেশ।এর মধ্যে প্রধান শর্ত হলো-ভারতকে জানাতে হবে ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ওই হাইভোল্টেজ লাইন দিয়ে প্রবাহিত করা হবে কি না।কারণ,এতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দ্বিতীয় শর্ত হলো-নেপাল ও ভুটান থেকে সস্তায় জলবিদ্যুৎ আমদানির জন্য আলাদা গ্রিড লাইন তৈরির সুযোগ বাংলাদেশকে দিতে হবে।তৃতীয়টি হলো-ওই লাইন দিয়ে বাংলাদেশ কী পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে,তা স্পষ্ট করতে হবে। চতুর্থ শর্ত হলো-বাংলাদেশের ওপর দিয়ে লাইন টানার আগে অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি হিসাব করতে হবে।ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ৬ আগস্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তিনি ৭৬৫ কেভি গ্রিড লাইন নির্মাণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। সাক্ষাৎ শেষে ইকবাল হাসান মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, ‘ভারত যেভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গ্রিড লাইন নিয়ে যেতে চাচ্ছে, সেভাবে আমরা চিন্তা করছি না।

নেপাল,ভারত,ভুটান ও বাংলাদেশ-এই চার দেশ মিলে যৌথ গ্রিড লাইনের কথা ভাবছে ঢাকা। আর এটি নিয়েই আলোচনা করতে চাচ্ছি আমরা।’ জানা যায়, এর আগে জুলাইয়ের শেষে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ দিল্লি সফর করে বিদ্যুৎ ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন সে দেশের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে। সেখানেও বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম সম্প্রতি বলেন,বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিশেষ করে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ভারত-নেপাল-ভুটানের সঙ্গে একটি গ্রিড লাইন নির্মাণ জরুরি। এর মধ্যে বাংলাদেশ যার কাছ থেকে সস্তায় বিদ্যুৎ পাবে, তার থেকে আমদানি করতে পারে।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ওই বছরের ১৯-২০ জুলাই দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিবের নেতৃত্বে একটি যৌথ ওয়াকিং গ্রুপ-জেডব্লিউজির বৈঠক হয়। সেখানে ৭৬৫ কেভির লাইন টানতে বাংলাদেশের পার্বতীপুর দিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার করিডর দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক আলাপ-আলোচনা হয়।

২০২৪ সালের সেই জেডব্লিউজির কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে।সেখানে দেখা গেছে,সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ব্যাপারে টেকনিক্যাল স্টাডি চূড়ান্ত করার তাগাদা রয়েছে দুই পক্ষের।বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে লাইনের নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং ২০২৮ সালে শেষ হবে। তবে দুই দেশের সচিব পর্যায়ের ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত তখন আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এবং তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি।এই লাইন নির্মাণ হলে বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হবে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু নেই কাগজপত্রে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেছেন, ‘বরনগর, পার্বতীপুর এবং কাটিহার লাইনটি হলে বাংলাদেশকে সস্তার ৫০০ থেকে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেবে ভারত।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জেডব্লিউজি বৈঠকে বলা হয়েছে,ভারত জানিয়েছে যে,এই হাইভোল্টেজ লাইন দিয়ে সস্তায় নেপাল, ভুটান ও ভারতের জলবিদ্যুৎ আমদানি করার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। কিন্তু এই লাইন দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশে কি পরিমাণে বিদ্যুৎ দেওয়া যাবে,এ ব্যাপারে কোনো উল্লেখযোগ্য যাচাই-বাছাই করা হয়নি। এমনকি ভারতের কোনো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প অথবা নেপাল, ভুটান থেকে প্রস্তাবিত হাইভোল্টেজ লাইন দিয়ে বিদ্যুৎ পরিবহণ করা যাবে কি না, তাও উল্লেখ করা হয়নি।এ ব্যাপারে সরকারি কাগজপত্রে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ওই লাইনের ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার বাংলাদেশের (পার্বতীপুর) ভেতর দিয়ে টানতে হবে। এজন্য আর্থিক লাভ-লোকসান কী হবে, সেই স্টাডি এখন পর্যন্ত হয়নি। তবে বাংলাদেশের বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে ভারতের অংশে ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো। ওই প্রকল্পগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর লাইন দিয়ে সঞ্চালন করা হবে কি না, তাও স্পষ্ট নয়।

ভারতের ঘোষণা অনুযায়ী, ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের ব্রহ্মপুত্র বেসিনে আপার সিয়াং মাল্টিপারপাস প্রকল্প, দুই হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের লোয়ার সিয়াং প্রকল্প, সাবানসিরি দুই হাজার মেগাওয়াট প্রকল্প (এটি আংশিকভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে), সাবানসিরি আপার ১ হাজার ৬০৫ মেগাওয়াট প্রকল্প (নির্মাণাধীন) এবং ডিবাং নদীতে ২ হাজার ৮৮০ মেগাওয়াট ডিবাং মাল্টিপারপাস প্রকল্পের আওতায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ চলছে। বাংলাদেশ মনে করে, ব্রহ্মপুত্রে একাধিক বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প করলে বাংলাদেশের পরিবেশের দারুণ ক্ষতি হবে।

কারণ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো চালু রাখতে শুষ্ক মৌসুমে পানির মজুত বাড়াতে হবে ভারতকে এবং নদীর গতিপথও পরিবর্তন করতে হবে। এটি করা হলে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পুরো বিষয়টি আমলে নিয়ে মেকং নদীর মতো একটি যৌথ স্টাডি করা যায়। যেটি কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও লাওস মিলে করেছিল কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে। ব্রহ্মপুত্রের নদীর পানি নিয়ে চীন, ভুটান, বাংলাদেশ এবং ভারত মিলে কমিশন গঠন করে সমীক্ষা হলে সবাই লাভবান হবে।

নেপাল ও ভুটান থেকে সস্তায় জলবিদ্যুৎ আমদানিতে আগ্রহী বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে নেপাল-ভুটানে সরাসরি বিনিয়োগও করতে চাইছে বাংলাদেশ। এজন্য বহুদেশীয় পৃথক একটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করতে আগ্রহী ঢাকা। এই লাইনের ব্যাপারে ভারতকে আগেও বলা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত ৭৬৫ কেভি লাইনের ওপর নির্ভর করলে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য ভারতের ওপর নির্ভর করতে হবে। মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত হচ্ছে-প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ বেচাকেনার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ৭৬৫ কেভি লাইনের ব্যাপারে আরও আর্থিক, কারিগরি ও পরিবেশগত সমীক্ষা করা যেতে পারে।

Top