১ লাখ ১৪ হাজার শিক্ষক কর্মচারী পাচ্ছেন অর্থ - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১ লাখ ১৪ হাজার শিক্ষক কর্মচারী পাচ্ছেন অর্থ


নুর নবী জনী : তিন বছরের বেশি সময় ধরে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের পাওনা না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছিলেন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী।অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১৫ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে। অবসরে গিয়ে চিকিৎসা,সংসার পরিচালনা বা সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় মেটাতে অনেকেই ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ দিচ্ছে। এর আওতায় অবসর সুবিধা বোর্ডের ৭০ হাজার এবং কল্যাণ ট্রাস্টের ৪৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অর্থ পাবেন। সব মিলিয়ে ১ লাখ ১৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এই কর্মসূচির আওতায় আসবেন। এ বিষয়ে আগামী ১৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করবেন শিক্ষামন্ত্রী। এতে বিস্তারিত বিষয় তুলে ধরা হবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা পাওনা অর্থ না পেয়ে চরম দুর্ভোগে ছিলেন। তাদের কষ্ট লাঘবেই সরকার এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ (সফটওয়্যার)-এর মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হবে। এতে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর কোনো সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।

অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদন নিষ্পত্তির কাজ চলছে। এ পর্যায়ে প্রায় ৭০ হাজার ১১৫টি আবেদন নিষ্পত্তির পরিকল্পনা রয়েছে। বেতনের ৬ শতাংশ কেটে নেওয়ার অর্থ পরিশোধ করলে প্রয়োজন হবে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো। বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, ১৩ আগস্টের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে দিন-রাত কাজ করছেন তারা। ১৫ দিন ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টানা কাজ করছেন। তারা বলেন, পুরোনো সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ায় ডিজিটালভাবে আবেদন যাচাই কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এখন অধিকাংশ আবেদন হাতে-কলমে যাচাই করতে হচ্ছে। এতে নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া যেমন ধীর হয়েছে, তেমনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরও কাজের চাপ অনেক বেড়েছে। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ৬ শতাংশ চাঁদা জমার ভিত্তিতে একজন শিক্ষক-কর্মচারী সর্বোচ্চ প্রায় ৫ লাখ টাকা পেতে পারেন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জমা হওয়া প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির কাজ চলছে। কল্যাণ ট্রাস্টে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৪ শতাংশ চাঁদা জমা অর্থ পরিশোধ করলে একজন সর্বোচ্চ প্রায় আড়াই লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন প্রায় ৫০ হাজার টাকা পেতে পারেন। যার জন্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা প্রয়োজন।

কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক ইউসুফ আলী বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অর্থ পরিশোধে সরকার একটি মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে। সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছুটির দিনেও অফিস করছেন। তিনি জানান, কল্যাণ ট্রাস্টে মাসিক আয় ৫০ থেকে ৫৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ২০০টি নতুন আবেদন জমা পড়ে। প্রতি মাসে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি। বর্তমানে জমে থাকা আবেদন নিষ্পত্তিতে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট মিলিয়ে ১ লাখ ১৪ হাজারের বেশি আবেদন পুরোপুরি নিষ্পত্তিতে প্রয়োজন ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ডের ৭০ হাজার আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রয়োজন ৯ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন মেটাতে প্রয়োজন ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ সরকারের বর্তমান ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পুরো সংকট নিরসনে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অবসর ও কল্যাণ তহবিলের বড় অংশই আসে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজস্ব জমা অর্থ থেকে। অবসর সুবিধার জন্য চাকরিকালীন তাদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ সুবিধার জন্য ৪ শতাংশ হারে অর্থ কেটে রাখা হয়। এছাড়া সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসর তহবিলে এবং ৩০ টাকা কল্যাণ তহবিলে জমা হয়। বাকি অর্থ সরকারি সহায়তা ও তহবিলের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে সমন্বয় করা হয়। যদিও প্রতি মাসে যে আবেদন জমা পড়ে তা নিষ্পত্তি করতে আয়ের চেয়ে বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। তাই প্রতি মাসে অনেক টাকা ঘাটতি থাকে। ফলে আবেদনের সংখ্যা নিষ্পত্তি করতে না পারায় বড় অংশ জমা হয়ে গেছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা জানান,বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত কাউকে অবসর সুবিধার অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ শুরু করে। ফলে শিক্ষকদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে। তবে বাদবাকি পাওনা টাকা কবে পাবেন এটা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কায় রয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।

Top