শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ, লাখ লাখ শ্রমিক কর্মহীন
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :গ্যাস সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।বুধবার থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় শত শত শিল্প-কলকারখানা অচল হয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কার্যত এখন কর্মহীন।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিগ্গিরই সংকটের সমাধান না হলে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পুরো অর্থনীতি। যার নেতিবাচক প্রভাব কমবেশি সমাজের সব ক্ষেত্রে পড়বে।চরম বিপাকে পড়েছেন শিল্পমালিকরাও। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বায়ারদের অর্ডার বাতিল হওয়ার উপক্রম। শিল্প-কলকারখানার জন্য বরাদ্দকৃত গ্যাসের বেশির ভাগ বুধবার থেকে পাওয়ার প্ল্যান্টে সরবরাহ করায় এই মহাসংকটে পড়েছে দেশের পুরো শিল্প সেক্টর। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে যুক্ত কয়েক কোটি মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এদিকে শিগ্গিরই সংকট নিরসনের কোনো আভাসও মিলছে না। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত হওয়ার মতো তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি। যদিও গ্যাসের এ সংকটের জন্য বর্তমান সরকার দায়ী নয়। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বিগত সরকারগুলোর ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। তবে এ সংকট সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাতদিন কাজ করছেন। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কীভাবে, কত দ্রুত এ সমস্যার টেকসই সমাধান করা যায়,সেজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান রাতারাতি করা সম্ভবও হচ্ছে না।
উদ্যোক্তারা বলছেন,এভাবে চলতে থাকলে শুধু কারখানার চাকা নয়, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির চাকাও থমকে যাবে। বেকার হতে পারে অনেকে। মালিকদের পক্ষে ব্যাংকের দায়-দেনা পরিশোধও কঠিন হবে। তাদের মতে, গ্যাস এখন আর শুধু জ্বালানি সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অন্যতম নিয়ামক শক্তি। তাই সরকারকে এ ব্যাপারে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছি। তিতাস গ্যাস স্বাভাবিক করতে এক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা করছি। মন্ত্রী বলেছেন ১০ তারিখের পর গ্যাস স্বাভাবিক হবে। এখন গ্যাস একদমই নেই। এ নিয়ে রোববার মন্ত্রীর সঙ্গে বসার চেষ্টা করছি। যদি মন্ত্রীর সঙ্গে বসতে পারি এবং সমাধান হয়, তাহলে ভালো। নয়তো সোমবার সংবাদ সম্মেলন করব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে হবিগঞ্জ এখন অন্যতম একটি হাব। আর গ্যাস সংকটের কারণে এই হবিগঞ্জে ১৭১টি শিল্পকারখানার উৎপাদন বুধবার থেকে বন্ধ। এতে কর্মহীন প্রায় দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী। প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। অপরদিকে নারায়ণগঞ্জে ৪৫০ ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ। এ কারণে বন্ধের পথে রয়েছে শতাধিক গার্মেন্ট। ইতোমধ্যে সাভার-আশুলিয়ায় প্রায় চার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এছাড়া শিল্পাঞ্চল হিসাবে পরিচিত গাজীপুর জেলায় কয়েকশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। রপ্তানি অর্ডার ও শিপমেন্ট বাতিলের আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। এভাবে হঠাৎ কারখানা বন্ধ হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তারা। যার প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে। জানতে চাইলে নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ডায়িং থেকে কোনো ফ্যাব্রিক্স (কাপড়) পাচ্ছি না। বর্তমানে গ্যাসের প্রেশার একেবারে শূন্যে নেমে এসেছে। ফ্যাব্রিক্সের অভাবে অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। তিনি বলেন, পুরো নারায়ণগঞ্জে শতাধিক গার্মেন্ট কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। নিজের ফ্যাক্টরির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ডায়িং থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফ্যাব্রিক্স না পাওয়ায় টানা ৭ দিন গার্মেন্টস বন্ধ ছিল। এরপর বুধবার কারখানা খুলেছিলাম। কিন্তু ফ্যাব্রিক্স না থাকায় বৃহস্পতিবার থেকে আবার কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। শনিবার কারখানা খুলব। এরপর ডায়িং থেকে ফ্যাব্রিক্স পাওয়া গেলে কারখানা চলবে, না হলে বন্ধ রাখতে হবে।’ তার মতে, গ্যাসের যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হচ্ছে আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে উন্নতি হবে না।
হবিগঞ্জে বন্ধ ১৭১ কারখানা : হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে গ্যাস সরবরাহ কমতে শুরু করে। তবে বুধবার থেকে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। জেলার ছোট-বড় ১৭১টি ফ্যাক্টরির প্রায় সবকটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়েছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী। গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এসব শ্রমিকের চাকরি সুরক্ষা করা কঠিন হবে।
শিল্পাঞ্চল গাজীপুরেও বন্ধ অনেক কারখানা : শিল্পাঞ্চলখ্যাত গাজীপুরে বিভিন্ন ধরনের কয়েক হাজার কলকারখানা রয়েছে। যার সবই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এমনিতে বছরজুড়ে সময়ে সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। কিন্তু এবার গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় এখানকার কলকারখানা বিপাকে পড়েছে। গ্যাসের অভাবে ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সাভার-আশুলিয়ায় ছাঁটাই হাজারো, শিপমেন্টে শঙ্কা : গ্যাস সংকটে সাভার-আশুলিয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলটিতে প্রায় দেড় হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে। পোশাক কারখানার বয়লার, ডায়িং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ও আয়রনিং বিভাগ স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। শিল্পমালিকদের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনের জন্য যেখানে গ্যাসের চাপ প্রয়োজন ১০ থেকে ১৫ পিএসআই, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৮ পিএসআই। কোথাও আরও কম। ফলে কোনো কারখানায় আংশিক উৎপাদন চলছে, আবার কোথাও কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন-চলতি মাসে সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় তিন থেকে চার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। স্থানীয় এক শ্রমিক নেতার দাবি-উলাইল, হেমায়েতপুর ও আশুলিয়ার ৩০০টির বেশি কারখানায় দুই হাজারের বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। আশুলিয়ার অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিট লিমিটেডে চলতি সপ্তাহেই ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে বন্ধ ৪৫০ ডায়িং, ঝুঁকিতে গার্মেন্টস : নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমেছে। এতে প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ডায়িং কারখানা থেকে ফ্যাব্রিক্স না পাওয়ায় শতাধিক গার্মেন্টসও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, কোনো কোনো গার্মেন্টস একদিন উৎপাদনে গেলে পরের দুদিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার ডায়িং থেকে কাপড় পাওয়া গেলে কয়েক দিন উৎপাদন চালানো হচ্ছে। এতে রপ্তানির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পাঠানো নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শহরের একটি গার্মেন্টসে প্রায় এক হাজার ৫০০ শ্রমিক অলস বসে আছেন। নরসিংদীর একটি স্পিনিং মিলে গ্যাসনির্ভর জেনারেটর বন্ধ থাকায় এক হাজার ২০০ শ্রমিকের কাজ বন্ধ। গ্যাস সংকটে সিএনজি স্টেশনও বিপাকে। নারায়ণগঞ্জে ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় প্রায় সবই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন চালকরা। বাসাবাড়িতেও সংকট তীব্র। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে অর্ডার বাতিল। এতে কর্মসংস্থান সংকোচন এবং রপ্তানি আয় কমবে।