সোলার ছাড়াও জলবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:ফুলবাড়ী কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা রাজনীতি করি এই দেশের জন্য, এই দেশের মানুষের জন্য। খুব স্বাভাবিকভাবে সংসদ-সদস্য উনার যে কনসার্নটি এক্সপ্রেস (উদ্বেগ প্রকাশ) করেছেন, অবশ্যই আমরা দেশে যে সমস্যাটি আছে জ্বালানির, এটিকে যেরকম আমরা সমাধান করতে চাইছি। আমাদের দেশে ফুলবাড়ীতে যে কয়লার কথা উনি বলেছেন, সেই কয়লা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো কয়লার মধ্যে একটি। কাজেই আমরা এই কয়লা উত্তোলন করে যদি জ্বালানি সংকট মেটাতে পারি অবশ্যই সেটা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা যেরকম সাশ্রয় করবে একইভাবে দেশের জন্য সেটি ভালো হবে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফুলবাড়ী কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি তা দেশের জন্য ভালো হবে। কিন্তু উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে গেলে বসতবাড়ি ও কৃষিজমির বিষয় আছে। আগে সেখানকার স্থানীয় মানুষের ‘সেটেলমেন্টের’ ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বুধবার জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের সংসদ-সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি আরও বলেন, ওপেন পিট (উন্মুক্ত পদ্ধতি) যদি করতে হয়, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে কিছু বসতবাড়ি আছে, সেখানে কৃষি জমি আছে। অবশ্যই সবচেয়ে আগে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কীভাবে সেই মানুষের সেটেলমেন্ট (স্থানান্তর) করা যায়। এরপর তাদের যাতে আয়-রোজগার বন্ধ না হয় বরং সেই প্রকল্প গ্রহণ করলে প্রকল্প থেকেও যাতে তারা কোনো না কোনোভাবে বেনিফিট পেতে পারে, সেই সব ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেই এবং অবশ্যই পরিবেশের যে বিষয়টি আছে, সেটিকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব। এর আগে সম্পূরক প্রশ্নে সাবিকুন্নাহার বলেন, সরকার সম্প্রতি জ্বালানি সংকট মোকাবিলার যুক্তিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উৎপাদনের আলোচনা করছে। এই পদ্ধতিতে অধিক কয়লা উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও কৃষিজমি, বসতি, ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর বিশেষ করে জীববৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। ফুলবাড়ী প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা অবশ্যই জরুরি কিন্তু উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের নামে যদি কৃষিজমি ধ্বংস হয়, হাজার হাজার মানুষ উচ্ছেদ হয় এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন জনগণের জন্য নয়। সরকারকে আগে পূর্ণ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা প্রকাশ করতে হবে এবং স্থানীয় জনগণের সম্মতি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে তিনি সরকারের মনোভাব জানতে চান।সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময়ে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে রীতিমতো পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান বা আমদানিনির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসাবে ১৫০টি কূপ খনন/ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৪০ এমএসসিএডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান ৭টি কূপ খনন শেষ হলে আরও ৮৫ এমএসসিএডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।তারেক রহমান বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাপেক্সকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আরও দুটি করে নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অফশোর ও অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সৌরপ্যানেল স্থাপনের অপরিহার্য পণ্যের কর অব্যাহতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে সংসদ নেতা বলেন, দেশীয় শিল্প ও সোলার প্যানেল শিল্প গড়ে তোলার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে লিথেনিয়াম ব্যাটারি যাতে এ দেশে উৎপাদিত হয়, সে জন্য কর মওকুফ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, আগামী ৬ মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন তাদের গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা করে কিনবে সরকার। তিনি বলেন, দেশের সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। সোলার ছাড়াও জলবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে।
নিলোফার চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লিথিনিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়ে বুধবার দুপুরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লিথিনিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার যেটি হবে, সেটির একটি সার্টিফিকেশন করে দেওয়া হবে। একটা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড ফিক্স করে দেওয়া হবে।
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা : মনিরুল হক চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করছে।