সামনে রয়েছে বিএনপি,পেছনে আওয়ামী লীগ, প্রশাসন সিন্ডিকেট,নদীপাড়ের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম বালুমহাল - Alokitobarta
আজ : শুক্রবার, ২১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিকল্প থাকার পরও শিল্পের গ্যাস বিদ্যুতে কেন,শত শত কারখানা বন্ধের উপক্রম বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলেন রিজভী মন্ত্রিসভায় রদবদল ও সম্প্রসারণের আভাস ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম সামনে রয়েছে বিএনপি,পেছনে আওয়ামী লীগ, প্রশাসন সিন্ডিকেট,নদীপাড়ের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম বালুমহাল ‎কাহালপুর ডা. মনসুর আহমদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হলেন রিয়াজুল ইসলাম সেহাংগল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বাইরে অবস্থান ও আড্ডা বন্ধে মতবিনিময় সভা বিদ্যুতে সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট ৮৯.৪%,গণভোট বাস্তবায়ন চান ৭০ শতাংশ, ‘সবার জন্য সমান’ নীতি বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

সামনে রয়েছে বিএনপি,পেছনে আওয়ামী লীগ, প্রশাসন সিন্ডিকেট,নদীপাড়ের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম বালুমহাল


মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:নদীর বুক চিরে অবৈধ ড্রেজারের তাণ্ডব ও রাতে ভারী ট্রাকের বিকট শব্দ। বিপরীতে স্থানীয় মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ। এমন চিত্র সারা দেশের বালুমহালে। শুধু তাই নয়, সহিংস নানা ঘটনায় বালুমহালগুলো পরিণত হয়েছে এক একটি ত্রাসের রাজত্বে।ক্ষমতার পালাবদলে কেবল সাইনবোর্ড আর মুখের ভাষা বদলায়, কিন্তু বদলায় না অপরাধ। শুধু ব্যক্তির বদল। অপরাধীরা থেকে যায় অধরা। এর নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ত্রিভুজ সিন্ডিকেটের ভয়ংকর তৎপরতা।সংঘবদ্ধ এই অপরাধের পেছনে আশ্রয়দাতা হিসাবে সামনে রয়েছে বিএনপি,পেছনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চক্র। অন্যদিকে রক্ষাকবচ হিসাবে অদৃশ্য সুরক্ষার চাদর বিছিয়ে রেখেছে প্রশাসন। জড়িত একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এখানেই শেষ নয়। এসব অপরাধ আড়াল করতে আছে একশ্রেণির সুবিধাভোগী সাংবাদিকও।

সব মিলিয়ে এ চক্রের অপতৎপরতায় বেসামাল সব ক’টি বালুমহাল। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে চলছে ইজারাদারদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য। ফলে নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা। এর প্রভাবে ভেঙে পড়েছে পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য।এদিকে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করলে জামানত বাজেয়াপ্ত ও ইজারা বাতিলে স্পষ্ট আইনি বিধান থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ নেই। আবার কোনো ঘটনায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রত্যাহার করা হয়। অনেক সময় আসল অপরাধীকে আড়াল করতে এভাবে লোক দেখানো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা দাপটের সঙ্গে বালু লুট করেছেন, তারা এখন আত্মগোপনে থেকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে গোপন আঁতাতে সফল হয়েছেন। এই দুই পক্ষের যোগসাজশ এবং পেশিশক্তির জোরে দেশের অধিকাংশ বালুমহাল এখন গুটিকয়েক সন্ত্রাসীর পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বালুমহালকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী ঘটনাগুলো যেন কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। মানিকগঞ্জের শিবালয়ে যমুনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে প্রকাশ্য দিবালোকে স্পিডবোটে এসে বালুমহালের ম্যানেজারকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় স্পিডবোট থেকে সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ার ঘটনা আরও ভয়াবহ।

জানা গেছে, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা থেকে শুরু করে সুরমা, যাদুকাটাসহ অনেক নদীর বুকে চলছে শত শত অবৈধ ড্রেজারের তাণ্ডব। ধ্বংসযজ্ঞ চলছে স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায়। মাঝে মধ্যে দিনের বেলায় লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করা হলেও রাতে দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু হয় বালু চুরি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ভয়ংকর ত্রিভুজ সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে বালুসন্ত্রাস আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট অনেকের।আরও জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত এক বছর মেয়াদে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থানাধীন যাদুকাটা নদীতে যাদুকাটা-১ (৮৯.৫৬ একর) বালুমহালটি ইজারা পান তাহিরপুর উপজেলা বিএনপি নেতা (দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি) নাছির মিয়া।

মানিকগঞ্জে পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতী, গাজীখালিসহ একাধিক নদীতে বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙন শুরু হয়। প্রতি বছর শত শত ঘরবাড়ি, জমিজমা হারিয়ে মানুষ নিঃস্ব হন। স্থানীয়দের দাবি, বালুমহালে বিধি বহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙন বেড়ে যায়। প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে নদীপাড়ের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম বালুমহাল। প্রশাসনের ভাষ্য, নিয়ম নীতি মেনেই বালুমহাল ইজারা দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণে নদী ভাঙন হলেও বালুমহাল এর জন্য দায়ী নয়।

তথ্য বলছে, প্রতি বছর দরপত্রের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে শর্ত সাপেক্ষে ইজারাদারের সঙ্গে চুক্তি হয়। বিগত বছরগুলোতে যারা বালুমহাল ইজারা নিয়েছেন তারা চুক্তির শর্ত ভেঙে সীমানার বাইরে থেকে বালু উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি। প্রশাসনের নগন্য অভিযানে শ্রমিকদের জেল জরিমানা হলেও ইজারাদার থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নমনীয় ভূমিকার কারণে ইজারাদার ইচ্ছে মাফিক বালু উত্তোলন করেন। ফলে নদীপাড়ের মানুষ ভূমিহীন, ভিটাহীন হয়েছেন। প্রতিকার না পাওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।জেলা প্রশাসক কার্যালয় জানায়, চলতি বছর মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন তিনটি বালুমহালের দরপত্র আহ্বান করেছে। গত ২৯ মার্চ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উন্মুক্ত দরপত্র অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে উপযুক্ত দরদাতা না থাকায় হরিরামপুরের লেছড়াগঞ্জ বালুমহালে দ্বিতীয় বারের মতো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চামটা-পৌলী-বিলবাড়িয়াবিল বালুমহালে বিজু এন্টারপ্রাইজ ইজারাদার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব আছেন মানিকগঞ্জ পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. কামাল হোসেন। শিবালয় উপজেলার তেওতা বালুমহাল পেয়েছে একরাম এন্টারপ্রাইজ। এ প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে আছেন জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক অয়ন খান।
ধুলশুড়া গ্রামের আনোয়ারা বেগম বলেন, “নদীভাঙনে সব হারিয়ে নতুন করে ১৪ শতাংশ জমিতে ঘরবাড়ি করেছিলাম। সেখানেও ভাঙনে সব নদীর পেটে যাচ্ছে। আগের বার প্রাকৃতিক কারণ থাকলেও এবার ড্রেজার মেশিনের কারণে জমি নদীতে গেছে।

সেলিমপুর চরের বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, “হরিরামপুরে পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়ে হাজার হাজার মানুষ সর্বশান্ত হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বালু কাটার ফলে নদীর পাড়ে ভাঙন বেড়েছে। যারা বালু কাটে তারা অনেক প্রভাবশালী এ কারণে অভিযোগ করে লাভ নেই। বালুমহালের ভেতরও কাটে, বাইরেও কাটে। ফলে বালুমহালের আশেপাশে ভাঙন শুরু হয়।”

স্থানীয়রা জানান, এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা এসব বালুমহাল ইজারা নিয়ে থাকেন। তারা নিয়ম নীতি অনুসরণ করেন না। এসব বিষয় প্রশাসন জানলেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয় না। বালু উত্তোলনকারীরা কাউকে পরোয়া করেন না। বালুমহাল থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হলেও ক্ষতির পরিমাণ বেশি।

বালুমহাল ইজরা পাওয়া বিজু এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. কামাল হোসেন বলেন,গত বছরও এই প্রতিষ্ঠান বালুমহাল ইজারা পেয়েছিল। শর্ত ও নিয়ম মেনেই বালু উত্তোলন করা হয়। কারো ক্ষতি করেবালু নেওয়া হয় না। কোনো অনিয়ম হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।

বালুমহালের কারণে নদীপাড়ে ভাঙন বেড়ে যায় তারপরও কেন বালুমহাল ইজারা দেওয়া হচ্ছে এমন বিষয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন,আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড,স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পর তা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়। হাইড্রোগ্রাফিক প্রতিবেদনসহ সব প্রকার যাচাই বাছাই শেষে বালুমহাল ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ধরনের ক্ষতির বিষয়াদি থাকলে এতগুলো দপ্তর অনাপত্তিপত্র দিতেন না।

জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন,প্রাকৃতিক কারণে নদী ভাঙন সংগঠিত হয়ে থাকে। বালু মহালের কারণে নদী ভাঙনের সম্ভাবনা নেই। যথাযথভাবে নিয়ম মেনে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।বিগত বছরগুলোতে নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন করেছেন ইজারাদার এমন বিষয় জানালে তিনি বলেন, “নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। তাদের নির্ধারিত সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কেও আইন অমান্য করলে ইজারা বাতিল করে দেওয়া হবে।

একই সময়ের জন্য যাদুকাটা-২ (৩৯৮.০৪ একর) বালুমহালের ইজারা পান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেল আহমেদ। কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও আইনের ফাঁক গলে ইজারাদাররা এখনো বালু উত্তোলন করছেন। সিন্ডিকেট সদস্যরা এখান থেকে দিনে কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে। এক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শতাধিক ক্যাডার।চাঁদা আদায়ে ক্যাডার বাহিনীর সক্রিয় সদস্যরা হলেন-রাণু মেম্বার, মোশাহিদ হোসেন, পাথর মুত্তালিব, ফিরোজ আলী, মোশালম, মান্না শাহ, আতাউর, রুবেল মিয়া, রাকাব উদ্দিন, হাকিকুল, আক্কাছ, লোকমান, মোবাশ্বির, আবুল হোসেন, রতি মিয়া, ইসলাম উদ্দিন, সেলিম চৌধুরী, ইদু মিয়া, আবু ইসলাম, ইকরাম, সুমন, গোলাম রব্বানী, বোরহান, হাসান, হাবিবুর, আব্দুল কাইয়ুম, মনসুর, সাজ্জাদ (বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্য) ও কয়েকটি গণমাধ্যমের কয়েকজন বিতর্কিত কর্মীসহ অনেকেই।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ আমলে যাদুকাটা নদীর বালু সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক মুজিবুর রহমান এবং জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রতন মিয়ার হাতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন।বিএনপির একজন সংসদ-সদস্যের ছত্রছায়ায় নাছির মিয়া ও বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল হুদা মুকুটের প্রতিনিধি শাহ রুবেল এই সিন্ডিকেট সক্রিয় রেখেছেন। রুবেলের সঙ্গে আওয়ামী অংশে আছেন আলমগীর ও মোবারক হাজিসহ অনেকেই। আর নাছিরের সঙ্গে বিএনপি অংশে আছেন জুনাব আলী, আনিসুল হক, মুস্তাক আহমদ, শাখাওয়াত প্রমুখ।

বালু লুটে আরও যাদের নাম বেরিয়ে এসেছে তারা হলেন-চাঁন মিয়া মাস্টার ওরফে চান্দু, আবু সাঈদ, সামসু আলম, আকাশ, মনর, আব্দুল্লাহ, সুবেল, আব্দু হান্নান, এমামুল, মাসুক সর্দার, রায়হান উদ্দিন রিপন, জামাল, বিল্লাল, রহিছ ওরফে টেরা রহিছ, মান্নান, মালেক, ফারুক, খাজা মাইনুদ্দীন, জাহাঙ্গীর, আলম সাব্বির, তমিজ উদ্দিন, শফিকুল ইসলাম, সাইতু, ইসমাইল, খোকন, সবুজ প্রমুখ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিলেটের স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল তালুকদার জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন নির্বিঘ্নে চালু রাখতে প্রতিমাসে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকা ঘুস বা মাসোহারা হিসাবে দেওয়া হয়। মাসোহারা দিতে হয় নৌপুলিশ, থানা পুলিশ, ক্যাম্প পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সাংবাদিকদের। কতিপয় সাংবাদিক ও স্থানীয় মিডিয়া প্রতিনিধিদের ৩টি স্তরে মাসোহারা দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, যাদুকাটা নদীর বালুমহাল থেকে তাহিরপুরের স্থানীয় অসাধু সাংবাদিকরা প্রতিমাসে দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার, জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিরা পাঁচ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং সিলেটে ব্যুরো অফিসের দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন সাংবাদিক মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা পান। এদের মধ্যে তাহিরপুরের একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক দিনে চাঁদা নেন ১০ হাজার টাকা।

এছাড়া পরিবারের এক সদস্যকে দিয়ে রাতের বেলা নয়টি ড্রেজার চালিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেন। এ খাত থেকে দৈনিক আয় করেন পাঁচ লাখ টাকা। এর বাইরে তিনি চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ঢাকায় অবস্থানরত কয়েকজন সাংবাদিকের মাসোহারা ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, অবিশ্বাস্য হলেও এসব তথ্য সত্য। অলিখিত এই প্র্যাকটিস চলে আসছে দুই-তিন দশক ধরে। ফলে বালুমহাল থেকে রাজনীতিবিদ, পুলিশ সদস্য, স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের অবৈধ সুবিধা নেওয়া যতদিন বন্ধ হবে না, ততদিন এই বালু সন্ত্রাস চলতে থাকবে। বরং আরও বাড়বে।

সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ-সদস্য (এমপি) কামরুজ্জামান কামরুল সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া এক ডিও লেটারে (আধাসরকারি পত্র) বালু সন্ত্রাস বন্ধে হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অসাধু চক্র দিনের পর দিন যাদুকাটা নদীর তীর কেটে অবাধে বালি বিক্রি করে আসছে। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে নদীতে নির্মাণাধীন সেতু, এশিয়ার বৃহত্তম শিমুল বাগান এবং লাউড়ের গড়, ঘাগটিয়া, ঘরঘাটি ও বিন্নাকুলি বাজারসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এ বিষয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশ ফোর্স কেবল দায়সারা দায়িত্ব পালন করে। দু-একদিন দু-চার মিনিটের জন্য পুলিশ উপস্থিত হলেও বাস্তবে কোনো কাজেই আসছে না। পুলিশের এই ঢিলেঢালা ভূমিকার সুযোগে দুষ্কৃতকারীরা রাতের অন্ধকারে প্রতিনিয়ত নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালি ও পাথর উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : জানতে চাইলে পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি, মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন,সারা দেশের বালুমহালে নিয়মিত অভিযান চলছে। পুলিশের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এ বিষয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, ‘আমরা চাই না, মেয়াদ শেষ হওয়া ইজারাদাররা বালু তুলুক। এ কারণে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আপিল দায়ের করা হয়েছে। যে কোনোদিন আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হতে পারে। শুনানি শেষ হলে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হবে।’ সাবলিজ এবং অবৈধ চাঁদা আদায়ের তথ্য তার জানা নেই বলে তিনি যুগান্তরকে জানান।

স্থানীয় বিএনপি নেতা ও যাদুকটা-১ বালুমহালের ইজারাদার নাছির মিয়া বলেন, দেশের অন্যান্য বালুমহাল থেকে যেভাবে বালু উত্তোলন করা হয়, যাদুকাটা নদী থেকেও একইভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি নথিতে এপ্রিলের ১৩ তারিখ মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও আমরা গত ফেব্রুয়ারিতে সময় বাড়ানোর (এক্সটেনশন) আবেদন করেছি। সে অনুযায়ী আরও প্রায় দেড় মাস মেয়াদ রয়েছে।

যাদুকাটা-২ এর ইজারাদার শাহ রুবেল আহমেদ বলেন,নির্ধারিত সময়ে আমরা ইজারা বুঝে পাইনি। নির্ধারিত সময়ের প্রায় পাঁচ মাস পর, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে আমাদের নদীর দখল হস্তান্তর করা হয়। ফলে নিয়মানুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত আমাদের ইজারার মেয়াদ বহাল রয়েছে।

Top