বন্দির মাথায়, কানে বা বুকে গুলি করতেন জিয়াউল - Alokitobarta
আজ : শুক্রবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের লুটপাটের ময়দানে পরিণত হয়েছে বিআরটিসি কোটি কোটি টাকা লোপাট চলছে দুদকে অভিয... বরিশালে ডাঃ তহুরার হাতে বলি হলো উদীয়মান উদ্যোক্তা নাজিয়া মাইশা পে ফিক্সেশনের পর তিন মাসের বকেয়া সমন্বয় রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ চাপের আহ্বান বাংলাদেশের ঢাকার সাবেক পুলিশ সুপারসহ ৬ কর্মকর্তা বরখাস্ত জীবনযাত্রায় চাপ,দেশজুড়ে বাজার-গণপরিবহণে অস্থিরতা নতুন রাস্তা কেটে নালা দ্বিগুণ ব্যয়ে ডাস্টবিন এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের চেষ্টা ,সারা দেশ,রাজধানীসহ কড়া নজরদারি পুলিশের ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে শুল্ক না কমিয়ে দাম বৃদ্ধির পথেই হাঁটল সরকার

বন্দির মাথায়, কানে বা বুকে গুলি করতেন জিয়াউল


নুর নবী জনী:বন্দির মাথায়, কানে বা বুকে গুলি করতেন জিয়াউল স্যার।কাউকে একটি,আবার কাউকে দুটি গুলি করতেন। এরপর বন্দিদের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী আব্বাস মল্লিক এ কথা বলেছেন। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনি জবানবন্দি দেন।

ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে দশম সাক্ষী হিসেবে আব্বাস মল্লিকের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। ৬০ বছর বয়সি এই সাক্ষীর বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চরদুয়ানী গ্রামে। তিনি পেশায় জেলে। হাল চাষও করেন। তারা তিন ভাই ও চার বোন। তার ছোট ভাইয়ের নাম আলকাছ মল্লিক।জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক বলেন, মাঝেমধ্যে আমাদের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন আলকাছ মল্লিক। আমাদের মাছ ধরার ট্রলারের মালিক ছিলেন আলকাছ। সৌদি আরবে ছয়-সাত বছর চাকরি করে চরদুয়ানীতে ফিরে আসেন। এরপর মাছ ধরার দুটি ট্রলার তৈরি করেন ছোট ভাই। একটার দায়িত্বে ছিলাম আমি। আরেকটি জলিল মাঝিকে দেন।

সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে চরদুয়ানী ও কাঁঠালতলীতে আসা-যাওয়া করতেন র‌্যাব সদস্যরা। ট্রলার মালিকদের ডেকে অভিযানে যেতেন তারা। যেদিন র‌্যাব সদস্যরা আমাদের এলাকায় আসতেন, সেদিন বিকালে সাদা পোশাকে দুজন ঘোরাফেরা করতেন। তারা দোকান মালিকদের ডেকে বলতেন, সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ ও বাতি নিভিয়ে রাখতে হবে। রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র‌্যাবের চার-পাঁচটি মাইক্রোবাস এসে বরফ মিলের সামনে থামত। এরপর গাড়িতে করে ঢাকা থেকে আনা বন্দিদের ট্রলারে তোলা হতো। তাদের হাত ও চোখ বাঁধা থাকত। বন্দিদের ট্রলারে উঠানোর পর সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা রিয়াজের দোকান থেকে নিতেন র‌্যাব সদস্যরা।

আব্বাস মল্লিক বলেন, বন্দিদের তোলার পর আমাদের ট্রলার চালাতে বলা হতো। এরপর বলেশ্বর নদীতে যেতাম। আমাদের গভীর পানিতে যেতে বলা হতো। গভীর পানিতে গিয়ে আমরা ধীর গতিতে ট্রলার চালাতাম। ট্রলারের পাটাতনের নিচকে বলে খোন্দা আর ওপরের ছাউনি সংবলিত ঘরকে বলে ব্রিজ। গভীর পানিতে যাওয়ার পর বন্দিদের ব্রিজ ও খোন্দা থেকে বের করে আনতেন র‌্যাব সদস্যরা। আমাদের ট্রলারের দুই সাইডে সাপোর্ট নামক একটি অংশ থাকে। একজন বন্দিকে বের করার পর দুইজন র‌্যাব সদস্য ওই সাপোর্টের ওপর বসিয়ে চেপে ধরে রাখতেন। এরপর ওই বন্দির মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলি করতেন জিয়া স্যার। কাউকে একটি গুলি, আবার কাউকে দুটি করতেন। এরপর লাশের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এভাবে একেক করে মারার পর সুন্দরবন যেতেন তারা।

এই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সুন্দরবন যাওয়ার পর অন্য বন্দিদের ট্রলার থেকে বের করে নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো। এরপর সাংবাদিকদের ফোনে কল দিয়ে ডেকে আনতেন র‌্যাব সদস্যরা। পরে বিভিন্ন থানায় এসব লাশ জমা দেওয়া হতো। সাক্ষী আব্বাস মল্লিক বলেন, ট্রলারগুলোকে ধুয়ে আমরা চরদুয়ানীতে আসতাম। তবে বোট ধোয়ার সময় বন্দিদের কাটা পেট থেকে বের হওয়া নাড়িভুঁড়ি দেখতে পেতাম আমরা। মাথায় গুলি করলে মগজও বেরিয়ে আসত। এছাড়া বন্দিদের শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হতো। এরপর আমরা সুন্দরবন থেকে চরদুয়ানী বরফ মিলে ফিরে যেতাম। তখন মেজর সাব্বির বলতেন, ‘তোমাদেরকে জিয়া স্যার ডাকেন’। এরপর আমরা মাঝিরা জিয়া স্যারের কাছে যেতাম। তিনি আমাদের প্রত্যেককে কখনো দুই হাজার, কখনো পাঁচ হাজার টাকা দিতেন। এসব টাকা খামে করে দেওয়া হতো। আমার ছোট ভাই আলকাছ র‌্যাবের সঙ্গেই কাজ করতেন।

তিনি বলেন, ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র‌্যাব থেকে আলকাছ মাঝিকে ফোন দিয়ে বলা হয়, ‘জিয়া স্যার তোমাকে বটতলা মানিকখালী আসতে বলেছেন।’ র‌্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে বাজারে আলোচনা করতেন আলকাছ মাঝি। তখন অন্যান্য ট্রলার মালিকরা আলকাছকে বলতেন, ‘র‌্যাব তোমার ওপর খুব খ্যাপা।’ ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র‌্যাবের পরিচয় দিয়ে আলকাছকে ফোন করা হলে দুপুরের ভাত খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। ওইদিন সন্ধ্যা ৭টা-৮টার দিকে আলকাছের স্ত্রী আমাকে ফোনে কল দিয়ে বলেন, ‘মাইজা ভাই, র‌্যাবের ফোন পেয়ে জিয়া স্যারের সঙ্গে দেখা করতে বটতলা মানিকখালী গেছেন আলকাছ। এখন তার ফোন বন্ধ পাচ্ছি।’ এরপর আমরা তাকে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে থানায় যাই। থানার লোকজন আমাদের খুঁজে দেখতে বলেন। পরে খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকা র‌্যাব অফিসে তার সন্ধান করি। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি। এ নিয়ে আমরা পাথরঘাটা থানায় একটি জিডি করি। জিডিতে জিয়া স্যার ও র‌্যাবের নাম লিখতে বলি। কিন্তু তারা নাম লিখেননি। তবে আমার ভাইকে আর খুঁজে পাইনি। হয়তো বন্দিদের মতো আলকাছকেও হত্যা করা হয়েছে। এজন্য জিয়া স্যারের বিচার চাই। আমি ওই সময় জিয়া স্যারকে দেখেছি। আজ তিনি ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আছেন। জবানবন্দি শেষে আব্বাসকে জেরা করেন জিয়াউল আহসানের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সাহিদুর রহমান।প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও তাসমিরুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, শাইখ মাহদী, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিম, অলি মিয়াসহ অন্যরা।

মনে হয় আমি সবার টার্গেট : ট্রাইব্যুনালে আনার সময় হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও গায়ে ভেস্ট পরানো থেকে অব্যাহতি চান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। বুধবার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘মাননীয় আদালত, সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন প্রশিক্ষণের সময় আমি কোমর ও ঘাড়ে ব্যথা পাই। কিন্তু ইদানীং কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার সময় আমার হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুকে ভেস্ট বা জ্যাকেট পরানো হয়। আমি এটা থেকে অব্যাহতি চাই। তবে মনে হয় আমি সবার টার্গেট। আমি সুবিচার চাই।’

এ নিয়ে প্রসিকিউশনের মতামত জানতে চান ট্রাইব্যুনাল।তখন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন,এটা জেল কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার। যদি তার প্রতি আচরণের কোনো ব্যত্যয় ঘটে থাকে বা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেআইনি কিছু করেন, তাহলে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারবেন। তবে আমার মনে হয়, নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে এভাবে আনা হচ্ছে। এ সময় জিয়াউলের উদ্দেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, প্রসিকিউশন বলছে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার স্বার্থেই এ ব্যবস্থা। জবাবে জিয়াউল আহসান বলেন, প্রিজনভ্যান থেকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানার দূরত্ব মাত্র পাঁচ গজ। এছাড়া গাড়ি থেকে নামানোর সময় ২০ জন পুলিশ সদস্য থাকেন। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, পাঁচ গজ নয়, এক গজ থেকেও কেউ চাইলে স্নাইপারে টার্গেট করতে পারেন। জিয়াউল জবাব দেন, এখানে টার্গেট নেওয়ার কোনো দিক নেই। ট্রাইব্যুনালে অনেক বেশি নিরাপদ। চাইলেই কেউ টার্গেট করতে পারবেন না। অতএব আমি এ থেকে অব্যাহতি চাই। পরে হাতকড়া ও ভেস্ট থেকে অব্যাহতির জন্য জিয়াউল আহসানকে একটি আবেদন করার পরামর্শ দেন বিচারক মোহিতুল হক। এ প্রসঙ্গে জিয়াউল আহসানের আরেক আইনজীবী নাজনীন নাহার বলেন, আমরা অবশ্যই আবেদন করব। কিন্তু প্রসিকিউশন কী চায়, সেটি দেখার বিষয়। এখানে তারা যা চায়, তা-ই হয়।

Top