গত ৫ মাসে কিছুই বদলায়নি’মির্জা ফখরুলের বক্তব্য নিয়ে নানা আলোচনা - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ১লা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গত ৫ মাসে কিছুই বদলায়নি’মির্জা ফখরুলের বক্তব্য নিয়ে নানা আলোচনা


মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন: গত ৫ মাসে কিছুই বদলায়নি’ বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যে দেশজুড়ে তোলপাড় তৈরি হয়েছে।এতবড় গণ-অভ্যুত্থানের পরেও মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আসেনি। আবার কেউ বলছেন, ক্ষমতার বাইরে থাকায় গত ১৯ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখ লাখ নেতাকর্মীকে আওয়ামী লীগের হামলা-মামলা মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হয়েছে। এ সময় কারও চাকরি আবার কারও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সরকারের কাছে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ সরকারের মতো দলের ভাবমূর্তি ধ্বংস হলে সেটিও বিএনপির জন্য ভবিষ্যতে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সুধী সমাজের মধ্যেও এ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা ও কৌতূহল। কারও মতে, একজন সজ্জন ব্যক্তি ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসাবে ফখরুলের যা বলার কথা তিনি তাই বলেছেন। এটা চরম সত্যি কথা।

এ প্রসঙ্গে পতনের আগে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার দেওয়া একটি বক্তব্য উদাহরণ হিসাবে টানছেন অনেকে। হাসিনা বলেছেন, ‘আমার বাসায় কাজ করেছে, পিওন ছিল, সেও এখন চারশ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না।’ অনেকের মতে, হাসিনার ওই বক্তব্যের দিনই নৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ সরকার ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই আওয়ামী লীগ সরকারের পরিণতির কথা বিবেচনায় নিয়ে বিএনপির কর্মকৌশল নির্ধারণ করা উচিত। করোনা মহামারির সময় ‘শুধু বাঁচতে চাই, আর কিছুই চাই না’ বলে সৃষ্টিকর্তার কাছে মানুষের আর্তি শোনা গেছে। কিন্তু করোনা দূর হওয়ার পরে মানুষের মধ্যে ঘুস-দুর্নীতি কমে গেছে বলে শোনা যায়নি। ফলে বাংলাদেশ থেকে তদবির বা দুর্নীতি রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটিও কেউ মনে করেন না। তবে ‘তদবির বা সুবিধা’ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কিছুটা হলেও সতর্ক থাকা দরকার বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানে বিতাড়িত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো নেতিবাচক ধারণা বা ‘পারসেপশন’ জনমনে যাতে তৈরি না হয়, সেটিও সরকারের বিবেচনায় রাখা উচিত। বিশেষ করে, ‘এবার দেশ বদলাবে’ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জনমনে এমন প্রত্যাশার কথা সবাই স্মরণ করছেন। তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদাহরণ হিসাবে সামনে আনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের জন্য তার অনেক উদ্যোগ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কিছু ছবি ও ভিডিও সাধারণ মানুষ খুবই ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। বিভিন্ন সময় তাকে নিজের ব্যাগ নিজেই বহন করতে দেখা গেছে। বৃষ্টিতে নিজের ছাতা নিজেই ধরে হাঁটছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেখা গেছে ধৈর্য ধরে ট্রাফিক আইন মেনে অপেক্ষা করতে। তিনি শিশুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। আবার সাধারণ মানুষের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত ও সহজভাবে মিশছেন। এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার ব্যক্তিগত আচরণ ও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সরকারের সব ক্ষেত্রে তিনি খরচে কাটছাঁট করছেন। কিন্তু মন্ত্রী ও সংসদ-সদস্যসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন কিনা সে প্রশ্ন আছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, দুর্নীতি, অন্যায় ও অবিচার মূলত সামাজিক ব্যাধি। একটি সমাজের সামগ্রিক পরিবর্তন না হলে এসব সমস্যার পুরোপুরি অবসান সম্ভব নয়। রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনা করছেন তো সেই পুরোনো মানুষরাই। তাই মাত্র পাঁচ মাসেই বড় ধরনের পরিবর্তন প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, চীনের মতো দেশে বড় বিপ্লব হয়েছে। বহু খ্যাতিমান নেতা জন্ম নিয়েছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে, নিয়মিত সংগ্রাম করছে। কিন্তু দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা, সম্পূর্ণ নির্মূলের অবাস্তব প্রত্যাশা নয়।

ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। কার্যকর আমলাতন্ত্র, দক্ষ পুলিশ বাহিনী ও শক্তিশালী বিচারব্যবস্থার ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে সমাজের নেতিবাচক শক্তিগুলো। তাই পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমে রাষ্ট্রযন্ত্রকে সুসংগঠিত ও কার্যকর করতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আশা করা যেতে পারে।

মির্জা ফখরুলের বক্তব্যকে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা নয়; বরং একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিকের সামাজিক উপলব্ধির প্রকাশ বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ।তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এমন আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।

আলতাফ পারভেজ বলেন, সমাজে এখন সৎ, দক্ষ ও জনমুখী মানুষের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের সমস্যা নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। একজন প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নতুন প্রজন্মের সৎ ও দক্ষ মানুষ গড়ে তোলা। তিনি বলেন, দেশের প্রশাসনের বড় একটি অংশ, শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অবক্ষয়ের শিকার। এই বাস্তবতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও সমাজ-উভয় ক্ষেত্রেই মৌলিক সংস্কার জরুরি।

বৃহস্পতিবার মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রচেষ্টায় পরিবর্তন দেখছেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেছেন, তারেক রহমান চেষ্টা করছেন এবং নতুন নতুন নজির স্থাপন করছেন। সেই নজিরকে যদি সবাই মিলে সামনে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে হয়তো বা পরিবর্তনটা হবে। তবে শিক্ষামন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী সচিবালয়ে তদবির কারকদের ভিড়ের কথা সামনে এনেছেন। তারা বলেছেন, তদবিরকারীদের ভিড়ে সচিবালয়েই ঢুকতে পারছেন না। মির্জা ফখরুলও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানুষের আত্মত্যাগ এবং গত ৫ মাসে রাষ্ট্র ও প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, আগে যারা ঘুস খেত, তারা ঘুস খাওয়ার ফন্দিফিকির করছে। একই ভাবে যারা ভালো একটা কাজ আটকে দিত, তারা এখনো তা আটকে দিচ্ছে। লোকজন ভোল পালটাচ্ছে।

গত ৫ মাসে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আক্ষেপ করে মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘আমি দেখছি যে কিছুই বদলায়নি। আক্ষেপে বলছি এজন্য যে, আমার বয়স অনেক। আমি তো সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমাদের মধ্যে আমি দেখছি না।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া:বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আমাদের মহাসচিব কিছুটা স্পষ্টভাষী হয়ে বক্তব্যটি দিয়ে ফেলেছেন।পরিস্থিতি আগের মতোই আছে’-এমনটা পুরোপুরি ঠিক নয়।কেননা,বিগত সরকারের আমলে যেভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে,বর্তমান সময়ে কি সেভাবে ঘটছে? অবশ্যই না; এর মাত্রা এখন অনেক কমে এসেছে।তার মতে, বহু বছরের পুঞ্জীভূত অনিয়ম-জঞ্জাল রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন,সরকারের ভেতরের এবং এত বড় দায়িত্বে থেকে যখন কেউ স্বীকার করেন যে ‘পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি’তখন তা কিন্তু মিথ্যা নয়। বরং দেশের বাস্তব চিত্রটাই সেখানে ফুটে ওঠে। বাস্তব সত্য হলো-দেশের মানুষ গভীর দুরাশায় দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, একই কথা যখন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলি,তখন আমাদের ওপর ‘বিরোধী দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী’ তকমা লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়! প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন,দেশবাসীকে স্পষ্টভাবে জানানো দরকার কেন পরিবর্তনের কাজগুলো হচ্ছে না? কারা এর পেছনে বাধা তৈরি করছে?

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন,মির্জা ফখরুল অত্যন্ত সাহসী ও নির্মম একটি সত্য উচ্চারণ করেছেন,যা আমার নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও সম্পূর্ণ মিলে যায়। সত্যটি হলো,গোটা দেশের দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয়গুলো এখনো পুরো ব্যবস্থার মধ্যে বাস্তবে অক্ষুণ্ন রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, এতবড় একটি গণজাগরণ ও রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটে যাওয়ার পরেও আমাদের আমলাতন্ত্রের মনোজগতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাদের পেশাগত কাজকর্মের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্নীতি সবকিছুই আগের মতোই অব্যাহত রয়ে গেছে। মির্জা ফখরুলের বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত সরকারের বাকি অংশ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিবর্তনের সেই ডাকে এখনো কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারেননি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স ফখরুলের বক্তব্যকে ‘যথোপযুক্ত’ বলে উল্লেখ করেন।তবে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন,আমি উনার কাছে জানতে চাই-উনি এই কথাটা কেন বললেন? হতাশা থেকে নাকি বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য? প্রিন্স বলেন, আমরা বিএনপির মহাসচিবের কাছে এই হতাশার বাক্য শুনতে চাই না। আমরা দেখতে চাই উনি এবং তার দল এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য ভূমিকা পালন করবেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন,বিএনপির মহাসচিবের বক্তব্যে একটি সত্য ও স্পষ্ট স্বীকারোক্তি ফুটে উঠেছে। বাস্তবতা হলো পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেনি। এ দেশের সাধারণ মানুষ এবং ছাত্র-জনতা একটি প্রকৃত পরিবর্তনের জন্যই এতবড় ত্যাগ স্বীকার করেছে। যদি পরিস্থিতির কোনো উন্নতি বা পরিবর্তনই না হয়, তাহলে লাভ কী হলো?

Top