সরকারের বর্তমান কাঠামো আড়াইতলা বা আড়াই স্তরবিশিষ্ট - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ২৫শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারের বর্তমান কাঠামো আড়াইতলা বা আড়াই স্তরবিশিষ্ট


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া : সরকারের বর্তমান কাঠামো আড়াইতলা বা আড়াই স্তরবিশিষ্ট। প্রথমতলায় ৬০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, দ্বিতীয়তলায় উপদেষ্টা পরিষদ এবং অর্ধেকতলায় বিভিন্ন বিশেষ সহকারীরা রয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকার রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না। সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত সংলাপে এসব কথা বলা হয়। সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে এ সংলাপের বিষয় ছিল ‘সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন।অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।বিশাল এই কাঠামোর সমন্বয় করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন খাতে ‘ইঙ্গিত দেখি কিন্তু সংগীত দেখি না’। অর্থনীতিসংক্রান্ত ৩১টি সূচকের মধ্যে ১৯টিই নেতিবাচক।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা বেশি। এই জনপ্রিয়তা দিয়ে তিনি নিজের দল, আমলা এবং সরকার পরিচালনায় কতটা দক্ষতা দেখাতে পারবেন সেটি বড় বিষয়। গত ছয় মাসে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে বেকার হয়েছেন ৬২ হাজার মানুষ। আর বছর শেষে রাজস্ব আয়ে দেড় লাখ কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এ ঘাটতি রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবের প্রতিফলন কি না, সেটিও ভাবতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সাহসের ঘাটতি আছে। তিনি বলেন, বেতন কাঠামো নিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ধাপে ধাপে বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও মানুষ মেনে নিত। সরকার এত দেরি না করে শুরুতে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা দিতে পারত। এরপর সময় চাইতে পারত। কিন্তু এখন বিষয়টি এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, বড় কিছু করা ছাড়া উপায় থাকবে না। এখন দেখার বিষয় হলো, শক্ত বাস্তবতা মোকাবিলায় সরকার কী পদক্ষেপ নেয়।

তার মতে, রাজনৈতিক সাহসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। যেসব প্রতিষ্ঠানে আইন তৈরি হয়, আইন প্রয়োগ হয় ও আইনের নজরদারি হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানকে সরকার দাঁড়াতে দেবে কি না, এটাই বড় প্রশ্ন। পুরোনো সরকারের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানগুলো চলবে কি না, তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার রাজনীতিকরণের দিকে নেওয়া হচ্ছে কি না।

ড. দেবপ্রিয়র মতে, সরকার যদি রাজনৈতিক পদায়ন করে, তাহলে এর জন্য নিজেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও আর্থিক খাতের সংস্কারের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর রাখতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষা করা না গেলে অন্যান্য সংস্কারও কার্যকর হবে না।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে তিনি রাজনৈতিক সাহস দেখিয়ে নিজের দলের লোকজনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন কি না এবং আমলাদের যথাযথ জায়গায় রাখতে পারেন কি না-এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, যে দেশে প্রতিষ্ঠান দুর্বল, নিয়ম-নীতিতে দুর্বলতা রয়েছে এবং বৈরী বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে দেশ পরিচালনা করতে হয়; সেই দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নেতৃত্বের ক্ষমতা ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। সরকারের হয়তো সদিচ্ছা আছে, কিন্তু সক্ষমতা ও সমন্বয় দেখাতে পারছে না।

তিনি বলেন, জনতুষ্টিবাদী পদক্ষেপগুলো আকর্ষণীয় হলেও কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের কর্মকাণ্ডের গতি ও দৃশ্যমান ফলাফল নিয়ে রূপক ব্যবহার করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, এখন পর্যন্ত অনেক ইঙ্গিত দেখি, কিন্তু সংগীত দেখি না। দেয়ার আর লট অব নয়েজেস বাট নো মিউজিক। আমাদের মিউজিকে যেতে হবে। অর্থাৎ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও ঘোষণা থাকলেও সেগুলোর সমন্বিত ও কার্যকর ফলাফল আরও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।

সরকার আগামী আড়াই বছর টিকবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় জানান, বাংলাদেশ একটি উত্তরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই উত্তরণকে গণতান্ত্রিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে হবে। আমরা আগাম এসব কথা বলছি সরকারের সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য। তারা সফল না হলে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা আমরা দেখি।

ড. দেবিপ্রয় বলেন, নতুন সরকারের কাছে দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল-অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে বড় দুর্বলতা হলো দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো সমন্বিত দলিল তৈরি না করা।

তিনি বলেন, সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সমন্বিত কোনো কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি। ইশতেহারে যেসব কমিশনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোরও অনেকগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ মূল্যায়ন করতে সিপিডি প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের তালিকা করেছে। এগুলোকে ৯টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর আওতায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নে রাখা হয়েছে। সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ ইতিবাচক। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের বিষয়টি উদ্বেগজনক। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতিরও ব্যত্যয় হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও মব সহিংসতা, নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে।

সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এ ঘাটতি সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১ হাজার ৯২০ শতাংশ। এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। নিট বৈদেশিক সহায়তাও ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছরের জানুয়ারি-আগস্ট মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।

Top