দেশে বেকার তরুণদের স্বপ্ন নিয়ে প্রতারণা
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:দেশে বেকারত্ব, সীমিত কর্মসংস্থান ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে মুক্তির আশায় প্রতিবছর হাজারো তরুণ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।এর মধ্যে অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।ছেলের বিদেশযাত্রার আশায় পরিবার বিক্রি করছে জমি, ভাঙছে সঞ্চয়, নিচ্ছে ঋণ।তারা ওয়ার্ক পারমিটের নামে টুরিস্ট ভিসা, জাল ই-ভিসা, ভুয়া চাকরির অফার কিংবা অস্তিত্বহীন নিয়োগপত্র দিয়ে প্রতারণা করছে। কেউ বিমানবন্দর থেকেই ফিরে আসছেন, কেউ আবার অন্য দেশে আটকা পড়ছেন। টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীদের দেওয়া হচ্ছে হুমকি।কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে।কেউ ওয়ার্কার ভিসায়, কেউ শিক্ষার্থী হিসাবে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দিতে চান।বিদেশে পাঠানোর নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গজিয়ে ওঠা অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি ও কনসালট্যান্সি ফার্মের চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া এমন ১৫টি প্রতারণার মামলা বিশ্লেষণ করেছে। এসব মামলার এজাহার, তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিদেশে চাকরি, স্টুডেন্ট ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, এমনকি অনলাইন বিনিয়োগের নামে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র মধ্যবিত্ত পরিবারকে টার্গেট করছে।একাধিক মামলার নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতারকরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিচিতজন কিংবা দালালের মাধামে আস্থা তৈরি করে। পরে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা আদায় করে। শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারেন, তাদের হাতে তুলে দেওয়া ভিসা বা কাগজপত্র জাল কিংবা অকার্যকর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে পুঁজি করে সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র মূলত মধ্যবিত্ত পরিবারকে টার্গেট করছে। কারণ এই শ্রেণির মানুষ শেষ সম্বল বিক্রি করে হলেও সচ্ছলতার আশায় পরিবারের একজনকে বিদেশে পাঠাতে চান। প্রতারকরা সেই আবেগকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে বিশ্বাস অর্জন করে, পরে ধাপে ধাপে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স, ভিসার সত্যতা এবং চাকরিদাতার তথ্য সরকারি মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।কোনো অবস্থাতেই মৌখিক প্রতিশ্রুতি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয়ের ভিত্তিতে টাকা লেনদেন করা উচিত নয়। ইতোমধ্যে এসব প্রতারণার ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।
একই গ্রামের ১৩ জনের স্বপ্ন চুরমার, হাতিয়ে নেওয়া হয় ৩৮ লাখ টাকা : মোজাম্মেল হক নামের এক ব্যক্তি তার এক বন্ধুর মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচিত হন। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ইউরোপে লোক পাঠানোর নিশ্চয়তা দিয়ে তার গ্রামের ১৩ জনকে উজবেকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, সার্বিয়া ও ব্রুনাইয়ে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে নগদ, ব্যাংক হিসাব ও চেকের মাধ্যমে অভিযুক্তকে মোট ৩৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়।
প্রথমে উজবেকিস্তানের ওয়ার্ক পারমিটের পরিবর্তে টুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয়। পরে তিনজনকে উজবেকিস্তানে পাঠানোর কথা বলে শ্রীলংকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে তারা আটকা পড়েন। অন্যদিকে উজবেকিস্তানে যাওয়া একজনও সেখানে কোনো কাজ পাননি। তাদের থাকা-খাওয়া ও দেশে ফেরানোর জন্য ভুক্তভোগীকে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়।
এরপর অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক পারমিটের আশ্বাস দিয়েও টুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয়। ওই যাত্রী বিমানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশন পুলিশ কাগজপত্র যাচাই করে তাকে ফেরত পাঠায়। পরে অভিযুক্ত আগের টাকাতেই সার্বিয়ায় পাঁচজনকে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে ভিসা দেয়। কিন্তু অনলাইনে যাচাই করে দেখা যায়, সার্বিয়ার ভিসাগুলোও জাল।
এক কোটি টাকার বেশি লেনদেন, শেষ পর্যন্ত জাল ভিসা : পল্টন থানায় দায়ের করা এক মামলায় মারহাবা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, জেএস ইন্টারন্যাশনাল কনসালটেন্সির দুই প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচয়ের পর তারা সার্বিয়া, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রস্তাব দেন।
সার্বিয়ায় চাকরি, প্রসেসিং, ভ্রমণ এবং দুই বছরের টিআরসি কার্ডসহ জনপ্রতি ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় ১৮ জনকে পাঠানোর চুক্তি হয় এবং মোট ১ কোটি ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৮০ টাকা দেওয়া হয়। অভিযুক্তরা ১৮ জন যাত্রীর জন্য সার্বিয়ার ই-ভিসা ও টিকিট সরবরাহ করে। কিন্তু ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই যাত্রীরা হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ যাচাই করে জানায়, ভিসাগুলো জাল।
সৌদি পাঠানোর নামে পাঁচ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ : পড়াশোনা না জানা শাসছু মিয়া অভিযোগ করেন, পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে সাহাব উদ্দিনের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে নয়াপল্টনের একটি কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের অফিসে সৌদি আরবে এমপ্লয়মেন্ট ভিসায় পাঠানোর বিষয়ে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় মৌখিক চুক্তি হয় এবং মোট ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পরে একটি ভিসাও দেন। কিন্তু ভিসাটি যাচাই করে শাসছু মিয়া জানতে পারেন, সেটি জাল।