গ্যাস সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫০০ শিল্পকারখানা - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্যাস সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫০০ শিল্পকারখানা


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:এলএনজিবাহী জাহাজ সংকটের কারণে শনিবার থেকে সরবরাহ কমানো হয়েছে আরও ৭ কোটি ঘনফুট।এতে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির চরম অবনিত ঘটেছে। কবে নাগাদ এ সংকট থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পাবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। তবে টার্মিনালের অপারেটর মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটর জানিয়েছে, আগস্টের প্রথমদিকে বন্ধ টার্মিনাল আংশিক চালু হতে পারে।সার দেশে গ্যাসের সরবরাহ আরও কমেছে।এর প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতসহ সর্বত্র। ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের প্রায় ২৫০০ শিল্পকারখানা। মঙ্গলবার মাতারবাড়ীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধের পর জাহাজ সংকটের কারণে গ্যাস সরবরাহ কমেছে দৈনিক ৪৫ কোটি ঘটফুট।
এমন বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে শিল্পকারখানা খাত। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, তিতাস গ্যাসসহ বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির এলাকাগুলোয় গ্যাসের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানায় উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে বহু শিল্পকারখানা উৎপাদন বন্ধ অথবা আংশিক চালু রাখতে পেরেছে। আবার অনেকে বেশি মূল্যের জ্বালানি ডিজেল কিনে কোনোরকমে ফ্যাক্টরি চালাচ্ছেন।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মাতারবাড়ীতে রোববার মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটরের বন্ধ ভাসমান টার্মিনাল পরিদর্শনে যেতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে মন্ত্রীসহ সরকারি কর্মকর্তাদের টার্মিনালে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি এক্সিলারেটর। এক্সিলারেটরের ভাষ্য, আগুনে টার্মিনালে বেশ ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতির ফলে এখন মেরামতের কাজ চলছে। ভাসমান টার্মিনালের কিছু যন্ত্রপাতি এবং কিছু বিশেষায়িত কেবল ইউরোপ থেকে আনার চেষ্টা করছে এক্সিলারেটর। মার্কিন কোম্পানি জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে টার্মিনাল থেকে ১ বা ২ আগস্ট থেকে আংশিকভাবে গ্যাস উৎপাদন শুরু হবে। আর সম্পূর্ণ চালু হবে ১০ আগস্ট থেকে।মাতারবাড়ীতে সামিট গ্রুপ এবং এক্সিলারেটরের দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ এক্সিলারেটর এনার্জির টার্মিনালে আগুন ধরে গেলে একটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে মারাত্মভাবে গ্যাসের সরবরাহ কমে আসে।

পরিস্থিতি আরও খারাপ : একটি ভাসমান টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার কারণে দেশের শিল্পকারখানাসহ সর্বত্র এর প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে তিতাস, বাখরাবাদ এবং পশ্চিাঞ্চাল ও জালালাবাদ এলাকার গ্রাহকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। তিতাস জানিয়েছে, রাজধানী এবং এর আশপাশের এলাকার বেশির ভাগ বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না। তবে সবচেয়ে আতঙ্ক ও চিন্তার বিষয়-গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। তিতাসের হিসাব অনুযায়ী, তাদের আওতায় শিল্পকারখানার গ্রাহক সাড়ে চার হাজারের বেশি। এর মধ্যে আশুলিয়ায় গ্যাসের চাপ নেমে এসেছে ৩০ পিএসআইতে (থাকার কথা ৭০ পিএসআই)। ধনুয়া এলাকায় গ্যাসের চাপ আছে মাত্র ১৬০ পিএসআই। অথচ থাকার কথা ৩০০ পিএসআই। আমিনবাজার এলাকা দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করার কথা দৈনিক ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। সেখানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪০ এমএমসিএফডি। এভাবে নরসিংদী, মাধবদী, রাজেন্দ্রপুর, কোনাবাড়ী, চন্দ্রা, সাভার-আশুলিয়া, হোতাপাড়া, নেত্রকোনা, জামালপুর, ভুলতাসহ বিভিন্ন এলাকার দুই থেকে আড়াই হাজার শিল্পকারখানা গ্যাসের অভাবে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। রাজেন্দ্রপুর এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইশরাক স্পিনিংয়ের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, গ্যাসের অভাবে সারা দিন ফ্যাক্টরি চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। অথচ কাজ করার জন্য শত শত শ্রমিক ফ্যাক্টরিতে বসে আছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, এক্সিলারেটর টার্মিনালের মাধ্যমে গ্যাস দিতে মঙ্গলবার গানবোর কোম্পানির এলএনজিবাহী জাহাজ সাগরে অপেক্ষা করেছিল। সেই জাহাজ আবার কারিগরি কারণে সামিটের টার্মিনালে যুক্ত হতে পারবে না। তাই সেটি বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরের দিকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বাদ সাধে চট্টগ্রাম কাস্টমস বিভাগ। তারা এর জন্য যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া গানবোরের জাহাজকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা পাড়ি দিতে দেয়নি। পরে সরকার এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিয়েছে।

কমানো হলো ৭ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ : আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে দিতে এখন শুধু সামিটের ভাসমান টার্মিনাল চালু আছে। সেটি থেকে স্বাভাবিক সময়ে এলএনজি দেওয়া হতো ৫০ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেটরের টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর সামিটের টার্মিনাল দিয়ে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে শুক্রবার পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হয় দৈনিক ৫৭ কোটি ঘনফুট। সেই সরবরাহ কমিয়ে এখন দেওয়া হচ্ছে ৫০ কোটি ঘনফুট। এর কারণ সামিটের টার্মিনালে এলএনজিবাহী জাহাজের সংকট। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা জানান, সামিটের টার্মিনালের জন্য নির্দ্দিষ্ট করা জাহাজ আসতে বিলম্ব হচ্ছে। তাই জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ ঠিক রাখতে সামিটের টার্মিনালের সরবরাহ একটু কমানো হয়েছে। যাতে হঠাৎ করে একেবারে এলএনজিশূন্য না হয়ে যায়। পেট্রোবাংলা এক্সিলারেটর টার্মিনাল বন্ধের আগে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করত ২৬৫ কোটি ঘনফুট। সেখানে এখন করা হচ্ছে ২১৩ কোটি ঘনফুট।

লোডশেডিং: জানা যায়, সামিটের টার্মিনাল দিয়ে সরবরাহ কমানোর কারণে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বেশ কমেছে। মঙ্গলবারের ঘটনার পর বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া হতো ৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। সেখানে এখন দেওয়া হচ্ছে ৬৮ কোটি ঘনফুট। এ কারণে সারা দেশে লোডশেডিংও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রোববার বিকাল ৪টায় সারা দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং হয়েছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। আগে হ্যাশভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো ৬ হাজার মেগাওয়াট। সেখানে এখন হচ্ছে ৩ হাজার ৮৮৫ মেগাওয়াট। সারা দেশে আগামী কয়েকদিন বৃষ্টি না হলে ভয়াবহ লোডশেডিং নেমে আসতে পারে বলে জানান বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এখন দৈনিক গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ২১০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৬৮ কোটি ঘনফুট, সার খাতে ১৫-১৬ কোটি, শিল্প ও ক্যাপটিভে ৯৩ থেকে ৯৪ কোটি ঘনফুট এবং অন্যান্য খাতে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুটের মতো গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

এদিকে এক্সিলারেটর তাদের প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে বলেছে, মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ টার্মিনালের বয়েলারে আগুন ধরে গেলে কন্ট্রোল সিস্টেমের যন্ত্রপাতি এবং কেবল পুড়ে যায়। যুক্তরাজ্য থেকে তিনজন বিশেষজ্ঞ এই ত্রুটি মেরামতের কাজ করছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কিছু পার্টস এবং কেবলের সংকট। সেগুলো ইউরোপ থেকে আনা হচ্ছে।

পুরো বিষয়টি জানতে এবং সংকট দ্রুত সমাধানে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ওই টার্মিনালে যেতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে রোববার তিনি মাতারবাড়ী যাননি। পরে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান চট্টগ্রাম যান। এক্সিলারেটরের সঙ্গে তার বৈঠক করা কথা রয়েছে। এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকার কারণে দেশের গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে জ্বালানি বিভাগকে।

Top