সংকটেও পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহতসহ নানাবিধ সঙ্কটের মধ্যেও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। এর ফলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই দেশের পোশাক রফতানি খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। ইপিবির তথ্যমতে, আগস্ট মাসে তৈরি পোশাক-বহির্ভূত বেশ কিছু পণ্যের রফতানিও ভালো হয়েছে, যা দেশের রফতানি বৈচিত্র্যকরণের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করেছে। এছাড়া মার্কিন প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশ ১০ শতাংশ শুল্কের মুখে রয়েছে। যেখানে প্রধান প্রতিযোগী চীন ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এই হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। আর তাই প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শুল্ক আড়াই শতাংশ কম। শুল্ক সুবিধার কারণে কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওই সব দেশ থেকে ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে স্থানান্তর করছেন, যার প্রভাবও পড়েছে রফতানি আয়ে।একই সঙ্গে গ্রাস-বিদ্যুৎ পরিস্তিতি স্বাভাবিক থাকলে রফতানি আয়ে ব্যপক পরিবর্তন আসতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে রফতানি আয় হয়েছে ৭৫০ কোটি (৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৭১৩ কোটি (৭ দশমিক ১৩ বিলিয়ন) ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে তৈরি পোশাক রফতানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক রফতানি ঘুরে দাঁড়ানোর ফলে আগস্ট মাসে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।তবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আগস্ট মাসে রফতানি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। তিনি বলেন, গত বছরের আগস্টে তৈরি পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার; তখন পাল্টা শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে চালান কমে যাওয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে রফতানি হ্রাসের ঘটনা ঘটেছিল। তাই ওই সময়ের থেকে এবার তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে, যার প্রবাব পড়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, সেই তুলনামূলক কম ভিত্তির বিপরীতে আগস্ট মাসে ৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের রফতানি উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার দেখালেও, প্রকৃতপক্ষে রফতানি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, ২০২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশে, যা শিল্পের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। তিনি বলেন, চলমান গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিকূল পরিস্থিতিÑসব মিলিয়ে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সময়েও এই প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে শিল্পের সক্ষমতা ও টিকে থাকার দৃঢ়তারই প্রতিফলন।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রফতানি ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে; আগের বছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার।
তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতই ছিল এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি; গত মাসে এই খাতের রফতানি ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আগস্ট মাসে নিটওয়্যার এবং ওভেনÑউভয় ধরনের পোশাকের রফতানিই আগের বছরের একই মাসের তুলনায় বেড়েছে।
ইপিবি জানিয়েছে, প্রধান বাজারগুলোতে জোরালো চাহিদা, নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের ফলে এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, উচ্চমূল্যের পণ্যের রফতানি বৃদ্ধি এবং পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা রফতানি আয় বাড়াতে সহায়তা করেছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশের তৈরি পোশাক খাতে রফতানি আয়ে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বছরভিত্তিক হিসাবেও আগস্টে পোশাক রফতানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছিল ৩১৭ কোটি (৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন) ডলারের। চলতি বছরের আগস্টে তা ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে ৩৬১ কোটি (৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়িয়েছে।
পোশাক খাতের উপ-খাতগুলোর মধ্যে নিটওয়্যার রফতানিতে তুলনামূলক বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে নিটওয়্যার খাত থেকে রফতানি আয় হয়েছে ২০৩ কোটি (২ দশমিক ০৩ বিলিয়ন) ডলার, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, একই সময়ে ওভেন পোশাক রফতানি ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়ে ১৫৭ কোটি (১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য (৩৭ দশমিক ০৯ শতাংশ), ওষুধ (২৮ দশমিক ৫২ শতাংশ), চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য (২৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ), মুদ্রিত সামগ্রী (২৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ), প্রকৌশল পণ্য (২৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ) এবং অন্যান্য পাদুকা (১৫ দশমিক ২৯ শতাংশ)।জুলাই-আগস্ট সময়ে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মুদ্রিত সামগ্রী (৪১ দশমিক ৮৯ শতাংশ), ওষুধ (৩৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ), অন্যান্য পাদুকা (২৭ দশমিক ৩২ শতাংশ) এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের (২২ দশমিক ২৬ শতাংশ) প্রবৃদ্ধি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রফতানি গন্তব্য দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আগস্ট মাসে ২৬ দশমিক ০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে; পাশাপাশি জুলাই-আগস্ট সময়ে দেশটিতে রফতানি ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাজ্যে পুনরায় দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি বাজারের অবস্থান ফিরে পেয়েছে এবং এর পরেই রয়েছে জার্মানি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডস। উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে তুরস্কে রফতানি ১৪১ দশমিক ০৩ শতাংশ বেড়েছে; অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও সউদী আরবে রফতানি যথাক্রমে ৪২ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও ৪২ দশমিক ০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইপিবি-এর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট সময়ে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রফতানি ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ৭৩ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে কৃষিপণ্য রফতানি ৯ দশমিক ১০ শতাংশ কমে ১৫৮ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলার, প্লাস্টিক পণ্য ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে ৪২ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার, তুলা ও তুলাজাত পণ্য ১৩ দশমিক ০২ শতাংশ কমে ৮২ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার এবং কৃত্রিম ফিলামেন্ট রফতানি ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ কমে ৬৩ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, নিট ও ওভেনÑদুই খাতেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা এবং এ খাতের টেকসই সক্ষমতার প্রতিফলন। তিনি বলেন, বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে হলে বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং পোশাক খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।