বিতর্কে শুরু বিতর্কেই সমাপ্তি - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ১৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিতর্কে শুরু বিতর্কেই সমাপ্তি


স্টাফ রিপোর্টার :তার মেয়াদকালে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য, শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ভূমিকা, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র প্রসঙ্গে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার তাকে বারবার রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।যখন মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন তখন সম্ভাব্য তালিকায় তার নাম ছিল না। হঠাৎ করে তাকে রাষ্ট্রপতি করায় আওয়ামী লীগের ভেতর তুমুল বিতর্ক উঠেছিল। এছাড়া তার কর্মজীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও তুমুল সমালোচনা ও বিতর্ক হয়েছিল। ওই সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কদমবুসি করার কথা নিজ মুখে গণমাধ্যকে বলে নগ্ন চাটুকারিতা প্রকাশ করেন এবং তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। এভাবেই বিতর্কের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল।আলোচনার বাইরে থাকা একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি বিতর্কের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। সবশেষ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করার পর বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ শরিকরা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের জোর দাবি তোলে। সংসদ ও সংসদের বাইরে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। সবকিছুর শেষ হলো শুক্রবার, সেটাও বিতর্কের মাধ্যমে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাংবিধানিক পদের ভারত্ব বজায় না রেখে নানা কথা বলেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি হিসাবে তার পুরো মেয়াদজুড়েই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, তিনি কি সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পেরেছিলেন? রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, কয়েকটি বক্তব্য ও অবস্থানের কারণে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে তার সমর্থকদের দাবি, তিনি সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন এবং সংকটময় সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভূমিকা রেখেছেন।জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও নতুন বিতর্ক : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি হিসাবে মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় আসে। সরকার পরিবর্তনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার পথ তৈরি করার ক্ষেত্রে সবকিছু করেন। পরে আবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর ওই সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাকে জোর করে কাজ করিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন।

সবশেষ গত কয়েকদিন ধরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে জোর গুঞ্জন চলছিল। এক সাক্ষাৎকারে তিনি পদত্যাগের প্রশ্নে সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, এটি ‘বিব্রতকর প্রশ্ন’। পরে শুক্রবার তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার কথা জানান। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকের ধারণা, শুধু শারীরিক অসুস্থতা নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক বিতর্ক, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং তার অবস্থান নিয়ে ক্রমবর্ধমান চাপও এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র বিতর্ক : গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র প্রসঙ্গে তার বক্তব্যকে ঘিরে। ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো প্রামাণ্য কপি তার হাতে ছিল না এবং তিনি তা সংগ্রহ করতে পারেননি। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। ওই সময়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এ বক্তব্যকে অসত্য বলে মন্তব্য করেন। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, রাষ্ট্রপতির ওই বক্তব্যের সঙ্গে সরকার একমত নয়। বিষয়টি তার সাংবিধানিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।

সাক্ষাৎকারেই বাড়ে বিতর্ক : দায়িত্ব পালনকালে একাধিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারও তাকে বিতর্কের মুখে ফেলে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে তার মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এসব বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তার অপসারণ চেয়ে আইনি নোটিশও দেওয়া হয়।

সংসদে ভাষণ বিতর্ক : আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি হয়ে সংসদে বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য দেওয়ায় তার দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিব্রত হন। তা নিয়ে সর্বমহলে তুমুল সমালোচনা হয়। তবুও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধী দলের সদস্যদের একাংশ প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রপতির ভাষণে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়নি। যদিও রাষ্ট্রপতির ভাষণ সরকারের প্রস্তুত করা নীতিগত বক্তব্য হিসাবেই সংসদে উপস্থাপিত হয়।

Top