বিতর্কিতদের কবজায় গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ পদ - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ২১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
বাংলাদেশকে ট্যাংক-মিসাইল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তোলার আহ্বান ফয়জুল করিমের দালালকে টাকা দিলে সব কাজ নিমিষেই হয়ে যায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবদানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দেওয়ার দাবি প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরো উন্নত এবং সহজ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ন... বাধ্যতামূলক অবসরে অতিরিক্ত ডিআইজি মিত্রদের ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীর, ৩১ দফা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নড়াইলে যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করে বেশিদিন রাজনীতি করা যাবে না পাসপোর্টে ফিরলো ‘ইসরায়েল ব্যতীত’, জলছাপে আসছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এনবিআর আইনবিষয়ক অদক্ষতায় রাজস্ব হারাচ্ছে

বিতর্কিতদের কবজায় গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ পদ


মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:তাদের কেউ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শিক্ষা প্রকৌশল পরিষদের নেতা,কেউ ছিলেন আওয়ামীপন্থি শিক্ষা ক্যাডার সমিতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে।আরেকজন ছিলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সিনেট সদস্য।এমন পাঁচজন কর্মকর্তা এখন বিএনপি সরকারে আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠ।তাদের কবজায় শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ। আর্থিক সুবিধার আওতায় তারা বসে আছেন পদে।এই তালিকার প্রায় সবার বিরুদ্ধে নানারকম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।কোনো কোনো অভিযোগের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন।জানা গেছে, এসব কর্মকর্তার ক্ষমতা এতই প্রকট যে, বঞ্চিত কোনো কর্মকর্তা প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে শাস্তি। তারা অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় আছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন বিতর্কিতরা থাকায় শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি শিক্ষা অধিদপ্তরের বেসরকারি কলেজ শাখায় সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন মো. ফিরোজ মিয়া। তিনি ৩০তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা। ২০২৪ সালের শিক্ষা ক্যাডার সমিতির আওয়ামীপন্থি প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখে বাড়তি সুবিধা নেন তিনি। আওয়ামীপন্থি এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে অনিয়ম ও নানা প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। এর আগে চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল তাকে শিক্ষা প্রশাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা হয়। শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে একের পর এক মো. ফিরোজ মিয়ার পদায়নকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রসঙ্গে মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, আমি নিজের আত্মরক্ষার জন্য আওয়ামীপন্থি প্যানেল থেকে নির্বাচন করেছি। এছাড়া আগে আমি কোনো লাভজনক পদে ছিলাম না।

চলতি বছরের ৩০ মার্চ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে পদায়ন করা হয় মোজাহিদুল ইসলাম আলিফকে। তিনি বঙ্গবন্ধু শিক্ষা প্রকৌশল পরিষদের সাবেক নেতা। অতীতে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিভাগীয় তদন্ত হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করা হয়।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওই তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে,২০২২ সালে ঢাকা মেট্রো জোনের অধীন রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজে আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের নাম উঠে আসে। প্রতিষ্ঠানটির ৬ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকার পুরো কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করেন।প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়,২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ওই ভবনের কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়।২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরেজমিন গিয়ে তদন্ত কমিটি দেখে ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়নি।তখন চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাই কাজ চলছিল।১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন না করেই অগ্রিম বিল পরিশোধ করেন মোজাহিদুল ইসলাম আলিফসহ তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা। প্রতিবেদনে এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়। এর আগে সাভার জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব পালনের সময় কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে দায়িত্ব পান মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ।তখন কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দেওয়ার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, আগারগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নতুন প্রধান কার্যালয়ের ১০০ কোটি টাকার নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নের সময় একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে তাকে ঢাকা মেট্রো জোনে পদায়ন করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ বলেন,আমার বিরুদ্ধে অনেকেই অনেক কিছু বলেন। এসব অভিযোগ সত্য নয়।

২০১৩ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (সেকায়েপ)-এ দায়িত্ব পান বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ২২তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো.আসাদুজ্জামান।এরপর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।বর্তমানে তিনি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (লেইস)’ প্রকল্পে উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।প্রকল্পটির বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে এই প্রকল্প। ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তাকে ফের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পদে নিয়োগ দিতে ব্যাপক তদবির চলছে। এর পেছনেও রয়েছে অর্থের কাজ কারবার।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ঠিকাদার নির্বাচনে অতীতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ছিল মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে।এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, এসি, ফটোকপি মেশিন, রাউটার, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল, আসবাবপত্র ও সফটওয়্যার কেনাসহ বিভিন্ন দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।বর্তমান প্রকল্পের সহকারী পরিচালক (প্রকিউরমেন্ট) বুলবুল আহমেদের সঙ্গে যোগসাজশে অনিয়ম করার পথ তৈরি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সহকারী পরিচালক বুলবুল আহমেদ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শেখ হাসিনার পক্ষে শিক্ষা ক্যাডারের সঙ্গে মাবনবন্ধনে ছিলেন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে স্লোগানও দেন। গত ১০ বছর ধরে মাউশির প্রকল্পে দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। এসব অভিযোগের প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রজেক্টের দায়িত্বে আছি। কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। এসব অভিযোগ সত্য নয়।

গত বছর ঢাকা সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের (টিটিসি) অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন ড.মো.খাদেমুল ইসলাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্যানেল থেকে সিনেট সদস্য পদে নির্বাচন করে বিজয়ী হন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর কলেজে শোকবার্তা কিংবা মিলাদের আয়োজন করেননি। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শোকবার্তা দিতে বাধ্য হন।এছাড়া হোস্টেলের বিভিন্ন ক্রয় যথাযথ ক্রয় কমিটি ছাড়াই সম্পন্ন করা, লেইস প্রশিক্ষণে ক্লাস না করেও সম্মানি নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিুমানের ব্যাগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় ৭ মাস তিনি বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) ছিলেন। এরপরও তাকে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ করা হয়।অভিযোগ প্রসঙ্গে ড.মো. খাদেমুল ইসলাম বলেন,আমি বঙ্গবন্ধু পরিষদে নির্বাচন করেছি। সেটি অস্বীকার করার কিছু নেই। আমি ক্লাস নিলে সম্মানি নেই না।এছাড়া ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়গুলো সবাই বোঝে না।

ড. মো. খাদেমুল ইসলামের সঙ্গে একই সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক হিসাবে নিয়োগ পান অধ্যাপক এসএম শহিদুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।শিক্ষা ভবনে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে মিছিল করা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েও প্রশাসনে স্বপদে বহাল রয়েছেন বেশকিছু আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন-মাউশির আইসিটি প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ ও সহকারী প্রকল্প পরিচালক মো. মেজবাহউদ্দিন মিনা,লেইস প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল হক ও প্রকল্প কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ,প্রকল্প কর্মকর্ত আলী আজগর চৌধুরী ও সমাজকল্যাণ পরিষদের উপ-পরিচালক রূপক রায়সহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।তাদের বিষয়ে একটি সংস্থা খোঁজখবর নিচ্ছে বলে জানা গেছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী এসব কর্মকর্তার বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক বলেন,শিক্ষায় কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। এ ধরনের কোনো প্রমাণ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।

Top