পাচারের অর্থ উদ্ধারে নতুন চ্যালেঞ্জ
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় নতুন ও জটিল এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।ফলে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে,দুর্বল হয়ে পড়ছে আইনি প্রমাণ সংগ্রহের ভিত্তি এবং দীর্ঘায়িত হচ্ছে অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া। এ বাস্তবতায় তথ্য আদান-প্রদানের গতি বাড়ানো,আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা (এমএলএ) চুক্তির পরিধি সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোনো সন্দেহভাজন পাচারকারীর বিষয়ে তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হলেই অভিযুক্তরা সেই অর্থ দ্রুত অন্য দেশে সরিয়ে ফেলছে।খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে ২১ মে অনুষ্ঠিত মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটির ২৮তম সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধবিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থ পাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিসইনভয়েসিং বা আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম বা বেশি দেখানো। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বৈধ বাণিজ্যের আড়ালে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওই সভায় আরও জানানো হয়, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য সংগ্রহে প্রচলিত প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া এতটাই দীর্ঘ যে সেই সময়ের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা চক্র অর্থ অন্য দেশে স্থানান্তর করে ফেলছে। এতে তদন্তের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে এবং অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো দেশে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য চাইতে হলে আবেদনটি প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং শেষে ওই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপে সময় লাগায় পাচারকারীরা পরিস্থিতি বুঝে অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিদেশি আইন প্রয়োগকারী ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি যোগাযোগের একটি দ্রুত ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে,এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে তথ্য আদান-প্রদান অনেক দ্রুত হবে এবং পাচারকারীদের অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ কমে আসবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আগেও সহযোগিতা ছিল। সাম্প্রতিক বৈঠকে সেই সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। যেসব দেশকে নতুন করে আগ্রহী বলা হচ্ছে, তারা আসলে আগে থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে। এখন সহযোগিতা আরও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তিকে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সরকার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে এমএলএ চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং (চীন) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের বড় অংশ গেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ডস এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে। এসব দেশের অনেকই আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত। ফলে প্রকৃত মালিকানা গোপন রাখা এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে দ্রুত অর্থ স্থানান্তর তুলনামূলক সহজ হওয়ায় তদন্ত আরও জটিল হয়ে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থ পাচার শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা রাজস্বের ক্ষতি করে না, এটি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত, সুশাসন ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই পাচারের অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা যেমন জরুরি, তেমনই নতুন করে অর্থ পাচার ঠেকানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অর্থ গোয়েন্দা সংস্থা ‘এগমন্ট গ্রুপ’-এর সদস্য হলেও এখনো আর্থিক তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনিময়ের বৈশ্বিক ব্যবস্থা কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস) এ যুক্ত হতে পারেনি। প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্কার শেষ না হওয়ায় এই সক্ষমতা অর্জন করা যায়নি। ফলে পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।