এনবিআর আইনবিষয়ক অদক্ষতায় রাজস্ব হারাচ্ছে
স্টাফ রিপোর্টার:এনবিআরের অভ্যন্তরীণ এক তদন্তে এ ধরনের অদক্ষতার বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।মাঠপর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদের আইনি অদূরদর্শিতা,পদ্ধতিগত ত্রুটি এবং উচ্চ আদালতে সঠিক সময়ে তথ্য জোগাতে ব্যর্থতার কারণে বড় অঙ্কের রাজস্ব হাতছাড়া হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)।
এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কর ফাঁকি রোধে নিয়োজিত এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতার ঘাটতি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসদাচরণ এবং আইনি প্রজ্ঞার ঘাটতি রয়েছে।উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংস্থাটি প্রয়োজনীয় অনুশাসন ও সতর্কবার্তাসংবলিত কঠোর নির্দেশনা জারির প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানা গেছে।এনবিআর সূত্র জানায়, আয়কর আইনের ৫৫ ধারার অধীনে বিচারিক প্রক্রিয়ায় করদাতার বকেয়া, কম পরিশোধিত বা ভুলবশত ফেরত দেওয়া করের পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।করের দায় সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরই কেবল ৩৭ ধারার অধীনে শাস্তিমূলক নোটিশ বা দণ্ডবিধির আশ্রয় নেওয়া যাবে।কিন্তু প্রথমেই তার বিরুদ্ধে ৩৭ ধারায় মামলা করে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।এ কারণে উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলায় হারছে এনবিআর। একই ধরনের ঘটনা ঘটছে রাজস্ব বোর্ডের তিন শাখা—কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়করের ক্ষেত্রে।
ভ্যাট আদায়:অপরাধ প্রমাণের আগেই শাস্তি,আদালতে ধাক্কা
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা কাস্টমসের প্রধান আইনি সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে, কর ফাঁকি, তথ্য গোপন বা অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগে দায়ের করা মামলার নথি অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো সরকারি আইন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছায় না। কখনো নথি পৌঁছায় নির্ধারিত সময় পেরোনোর অনেক পরে। বিশেষ করে কাস্টমস-সংক্রান্ত মামলার নথি উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে বিলম্বে পৌঁছানোর কারণে আপিল আবেদনে কারিগরি ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনি সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নথি পাঠানো হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করার সুযোগও হারাচ্ছে।
অভিযোগে বলা হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও কোনো সময়সীমা উল্লেখ না করেই বন্ড লাইসেন্স অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হচ্ছে। স্থগিত করার পর যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু না করে ফাইল চার থেকে পাঁচ মাস, এমনকি এক বছর পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। কাস্টমস অ্যাক্ট, ১৯৬৯-এর ধারা ১৩(৩) এবং কাস্টমস অ্যাক্ট, ২০২৩-এর ধারা ১২ অনুযায়ী কমিশনার অব কাস্টমস (বন্ড) যেকোনো প্রাইভেট বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে আইন লঙ্ঘন করে স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে, তা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।
আয়কর: তথ্য ছাড়াই ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ, ভুক্তভোগী করদাতারা
কর ফাঁকি ও অনিয়ম রোধে আয়করের মামলা করার ক্ষেত্রেও দায়সারা কাজের প্রমাণ পেয়েছে এনবিআর। অনেক মামলা হেরে যেতে হচ্ছে।এ.এ.এ. বনাম এনবিআর এবং অন্যান্য’ (রিট পিটিশন নম্বর: ১৯৮২৪/২০২৫) মামলা তেমন একটি। ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ২২৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই ওই করদাতার ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে বাদীর সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নন, এমন স্বজন বা পরিচিত ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবও ফ্রিজ করা হয়।
যখন কোনো সমঝোতা হয় না বা কাঙ্ক্ষিত সমঝোতা হয় না, তখনই এসব আইন অপব্যবহার করে মানুষকে হয়রানি করা হয়। অধিকাংশ মামলাই হয়রানিমূলক। প্রকৃত বা যৌক্তিক মামলার সংখ্যা হাতে গোনা দু-একটির বেশি পাওয়া যাবে না।২০২৬ সালের ১৮ মে হাইকোর্ট বিভাগ মামলাটির নিষ্পত্তি করেন। আদালত দেখেন, এনবিআরের অনুমতি নিয়ে আয়কর আইনের ২২৩(৩) ধারা মোতাবেক স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর নিয়ম থাকলেও কাস্টমস বা কর কর্তৃপক্ষ তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি চিঠি ইস্যুর এক বছর পার হলেও কোনো আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে হাইকোর্ট পুরো প্রক্রিয়াটিকে অবৈধ ও অকার্যকর হিসেবে ঘোষণা করেন।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কমিশনার অফিস সূত্র জানায়, আয়করের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অপপ্রয়োগের ফলে উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রের অধিকাংশ মামলা টিকছে না। নতুন করে মামলা শুরু করতে গিয়ে একদিকে সরকারের রাজস্ব পেতে বিলম্ব হচ্ছে, অন্যদিকে করদাতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এনবিআর জানায়, কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই যদি করদাতার ব্যাংক হিসাব স্থগিতের আদেশ জারি করা হয় এবং পরবর্তীতে তার সপক্ষে তথ্য খোঁজা হয়, তবে তা কর্তৃপক্ষের আইনি দুর্বলতা ও অদূরদর্শিতাকেই প্রকাশ করে। আদালত যদি দেখেন যে, আয় গোপন বা অবৈধ বিনিয়োগের কোনো অকাট্য তথ্য আগে থেকে কর্তৃপক্ষের কাছে ছিল না, তবে ব্যাংক হিসাব স্থগিতের পুরো আদেশটিই আইনি কর্তৃত্বহীন হিসেবে বাতিল হয়ে যাবে। এটি মূলত আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২২৩-এর একটি মারাত্মক ভুল ব্যাখ্যা।
‘হয়রানি করা এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ইচ্ছাকৃত কাজ’
এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ ধরনের ঘটনার কথা করদাতারা, বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা, দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন।এনবিআর বিষয়গুলো অনুসন্ধান করে নিজেরাই ব্যবস্থা নিলে ভালো হবে বলে মনে করছেন গবেষক ও ব্যবসায়ী নেতারা।এ ধরনের মামলা দিয়ে হয়রানি করা এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ইচ্ছাকৃত কাজ বলে মন্তব্য করেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী। তিনি বলেন, সাধারণত আইনের যে প্রয়োগ হওয়া উচিত, তারা তা সঠিকভাবে করে না। বরং আইনের অপব্যবহার করে। আর এই অপব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া, দুর্নীতি করা এবং অবৈধভাবে অর্থ আদায় করা।
আইনের অস্পষ্টতা,রাজস্ব কর্মকর্তাদের অবহেলা,অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা এবং অজ্ঞতার কারণে অনেক মামলা হয়। এসব মামলার ফলে একদিকে করদাতারা হয়রানির শিকার হন,অন্যদিকে সরকার রাজস্ব হারায়।তৈরি পোশাক শিল্পের এই উদ্যোক্তা বলেন,যখন কোনো সমঝোতা হয় না বা কাঙ্ক্ষিত সমঝোতা হয় না,তখনই এসব আইন অপব্যবহার করে মানুষকে হয়রানি করা হয়। অধিকাংশ মামলাই হয়রানিমূলক।প্রকৃত বা যৌক্তিক মামলার সংখ্যা হাতে গোনা দু-একটির বেশি পাওয়া যাবে না।তিনি বলেন,যদি কোনো প্রকৃত মামলা হয়,তাহলে আমরা তার পক্ষে আছি। আমরা ব্যবসায়ী সমাজও চাই দেশের মানুষ যথাযথভাবে আয়কর ও শুল্ক পরিশোধ করুক।কিন্তু সেটির জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন,তা নিশ্চিত করতে হবে। যিনি রাজস্ব সংগ্রহ করবেন, তার আচরণ, মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক হতে হবে।এসব ঠিক না থাকায় ব্যবসায়ী ও করদাতারা বিভিন্ন সময়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন।
‘অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা ও অজ্ঞতার কারণে মামলা হয়’
এ বিষয়ে নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আইনের অস্পষ্টতা, রাজস্ব কর্মকর্তাদের অবহেলা, অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা এবং অজ্ঞতার কারণে অনেক মামলা হয়। এসব মামলার ফলে একদিকে করদাতারা হয়রানির শিকার হন, অন্যদিকে সরকার রাজস্ব হারায়।
তিনি বলেন,মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যাতে ব্যবসায়ীদের ফাঁদে ফেলতে পারেন, সেই সুযোগ অনেক সময় নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই তৈরি করে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আইনে অস্পষ্টতা রাখা হয়,যাতে বাস্তবায়নের সময় ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা যায়।চাহিদামতো অনৈতিক সুবিধা না পেলে কর কর্মকর্তা বা ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস (ডিসিটি) ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক কর আরোপ করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে,বাজেট বা নীতিমালায় যত ভালো উদ্যোগই নেওয়া হোক,তার সফলতা নির্ভর করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মানসিকতার ওপর।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ গ্রহণের প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন,কর্মকর্তাদের এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ হবে না।
তবে মাঠপর্যায়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের সতর্ক করতে নেওয়া উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান।অন্যদিকে,আইনের অপব্যবহার বন্ধ,করদাতাদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং সুশাসন জোরদারে এনবিআরের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)ফেরদৌস আরা বেগম।তিনি বলেন,কারা কর কর্মকর্তা হবেন এবং কারা মামলা করার উদ্যোগ নেবেন,তা নির্ধারণের পাশাপাশি তাদের বিচার-বিবেচনার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে করদাতারা হয়রানির শিকার হবেন,সরকারের ব্যয় বাড়বে এবং রাজস্ব আদায় ব্যাহত হবে।তিনি বলেন,অনেক মামলা হচ্ছে। যারা উচ্চ আদালতে যেতে পারছেন,তারা অনেক ক্ষেত্রে মুক্তি পাচ্ছেন। কিন্তু যারা যেতে পারছেন না,তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।ফেরদৌস আরা বেগমের মতে,ব্যক্তিগত স্বার্থ, আইনি সীমাবদ্ধতা বা বিচার-বিবেচনার ঘাটতির কারণে আইনের অপব্যবহার হচ্ছে কি না,সেটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।তিনি আরও বলেন,কর-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি ও কর ফাঁকি রোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে,যাতে রাষ্ট্র রাজস্ব থেকে বঞ্চিত না হয় এবং করদাতারাও অযথা হয়রানির শিকার না হন।তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান।