দালালকে টাকা দিলে সব কাজ নিমিষেই হয়ে যায়
বিশেষ প্রতিনিধি :দালালকে টাকা দিলে সব কাজ নিমিষেই হয়ে যায়।ভুক্তভোগীরা জানান, মিরপুর বিআরটিএ- তে গেলে প্রথমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি জমা নেয়া হয়। এরপর বলা হয়, আপনার কাজ শেষ মোবাইলে মেসেজ যাবে। মেসেজ পেলে ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার জন্য আসবেন। এজন্য সম্ভাব্য তারিখও দেয়া হয়। কিন্তু দিন যায়, মাস যায়- মেসেজ আর আসে না। প্রকৃতপক্ষে কাগজপত্র আটকে রাখার কারণেই মেসেজ যায় না। ইন্সপেক্টর দুজন সেই কাগজপত্র ঘুষের আশায় আটকে রাখেন। এরপর দালালদের মাধ্যমে টাকা নেয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করে দেন। ভূক্তভোগীদের অভিযোগ ইন্সপেক্টর আফজাল ও ইমরান নামে এ দুজন ইন্সপেক্টরের সাথে ঢাকা বিভাগের পরিচালক শফিকুজ্জামান ভূঁইয়ার যোগসাজশ রয়েছে। তাদের কাছে থেকে শফিকুজ্জামান প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা পান।রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) কার্যালয় দালালচক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। গাড়ির কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দেয়ার পরেও কর্মকর্তারা সেই কাগজ অনলাইনে এন্ট্রি করার নামে আটকে রেখে গ্রাহকদেরকে হয়রানি করছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিরপুর বিআরটিএ’এর কার্যালয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় গাড়ির নাম পরিবর্তন শাখায়। এ শাখায় দুজন ইন্সপেক্টর রয়েছেন। প্রাইভেট মালিকানা শাখায় আফজাল হোসেন এবং বাণিজ্যিক শাখায় ইমরান। এই দু’জন ইন্সপেক্টর টাকা ছাড়া কোনো কাগজ অনলাইনে সাবমিট না করে মাসের পর মাস আটকে রাখেন। শেষে তদবির করতে মালিকপক্ষ আবার বিআরটিএ অফিসে খোঁজ-খবর নিতে গেলে ভোগান্তি এড়াতে দালাল ধরতে বাধ্য হন।
সরেজমিনে মিরপুর বিআরটিএর এ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রধান ফটক থেকে শুরু করে সর্বত্রই দালালের দৌরাত্ম্য। কয়েকজন ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এখানে নিয়ম মেনে কাজ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। পাশাপাশি নানান কাগজ (ডকুমেন্টস) চান সংশ্লিষ্টরা। এসব ভোগান্তি এড়িয়ে দ্রুত সময়ে কাজ করতে দালালের সহায়তা নেন তারা। সম্প্রতি বিআরটিএ কার্যালয়ে প্রবেশ করতেই এক দালাল বলেন, ‘লাইসেন্সের কাজ করবেন ভাই?’ এসময় এ কার্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে সর্বত্রই দালাল চক্রের সদস্যদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। যদিও দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধে দুদক ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থা মাঝেমধ্যে অভিযান চালায়, তবে অভিযান শেষে আবারও ফিরে আসে সেই আগের চিত্র। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মিরপুরে নিয়ম মেনে কাজ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। পাশাপাশি নানান ডকুমেন্টস চান সংশ্লিষ্টরা। এসব ভোগান্তি এড়িয়ে দ্রুত সময়ে কাজ করতে দালালের সহায়তা নেন তারা।
জানা গেছে, মিরপুরে বিআরটিএ- এর কার্যালয়ে প্রতিদিন সেবা নিতে আসেন হাজারও মানুষ। তবে এখানে স্বাভাবিক সেবা পেতে বড় বাধা দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পূর্ণরূপে ডিজিটালাইজেশনই দালাল নির্মূলের একমাত্র সমাধান। তবে সেবাপ্রার্থীরা জানান, ভোগান্তি কমিয়ে দ্রুত সময়ে কাজ করাতে ও কাগজ সংক্রান্ত ঝামেলা সমাধানে দালাল চক্রের সহায়তা নেন তারা।
কথা হয় ড্রাইভিং লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজে আসা একজন গ্রাহকের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি কিছু কাগজপত্র না আনায় একজন কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া সম্ভব নয়। পরে দালালের মাধ্যমে তিনি ৫ হাজার টাকা দিয়ে সেই কাজ করিয়ে নিয়েছেন। এরকম শত শত গ্রাহক আছেন যারা টাকা দিয়ে অবৈধভাবে কাজ করিয়ে নিয়েছেন। অথচ যারা নিজে গিয়ে বৈধ কাগজপত্র জমা দিয়ে স্বচ্ছতার সাথে কাজ করাতে চান তারা কোনো সেবা পান না। একজন ভুক্তভোগী জানান, তিনি কয়েক মাস আগে ব্যাক্তিগত গাড়ির নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করলে তাকে বলা হয় কয়েক দিনের মধ্যে গ্রাহকের জেলা অফিসে সেই কাগজপত্র পাঠানো হবে। এতে করে তাকে আর ঢাকায় আসতে হবে না। অথচ ৬ মাসের অধিক সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও তিনি সেই কাগজ জেলা অফিসে পাঠানো হয়নি। এতে করে আগের মালিকের নামেই তার ট্যাক্স জমা হচ্ছে। আরেকজন মালিক জানান, তিনিও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করে টাকা জমা দেয়ার পর তাকে বলা হয়, কয়েক দিনের মধ্যেই মোবাইলে মেসেজ যাবে। কিন্তু প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত হলেও সেই মেসেজ আসেনি। একজন দালাল তাকে জানিয়েছেন, আপনি আমাদের মাধ্যমে গেলে এমনটা হতো না। ওই দালাল তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে বলেছেন, এই টাকা আমি একা খাবো না। একদম উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত যাবে।
সেবাপ্রার্থী ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাধারণত বিআরটিএ কার্যালয়ে লাইসেন্সের কাজে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাগজের ত্রুটি ধরা পড়ে। বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখিয়ে কাজ আটকে দেয়। পরীক্ষায় ছোট ভুলেও ফেল করানো হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে একেক ধাপের পরীক্ষা দিতে হয়। এতে নানান ভোগান্তির শিকার হতে হয়। অথচ টাকা দিলে কোনো ভোগান্তি ছাড়াই দালাল চক্রের সদস্যরা সহজেই এগুলো করে দেয়।এ বিষয়ে কথা বলতে মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে ঢাকা বিভাগের পরিচালক শফিকুজ্জামানকে কল করলে তিনি সেই কল রিসিভ করেন নি। মোবাইলে মেসেজ দিয়েও তার কোনো উত্তর দেন নি।
.অভিযোগ রয়েছে ঢাকা বিভাগের পরিচালক হিসাবে শফিকুজ্জামান বদলি হয়ে আসর পর থেকে মিরপুর বিআরটিএ- তে দুর্নীতি বেড়েছ। বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশার নিয়ে নানান কায়দায় তিনি ঘুষ বাণিজ্য করে থাকেন। অথচ একসময় ভালো মানুণ হিসাবে তার নাম শোনা যেত। বিআরটিএ-এর প্রধান কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, মিরপুরে কি হচ্ছে তা আমি জানি না বা আমার এখতিয়ারভূক্ত নয়।