সংসদীয় এখতিয়ার ও গণভোটের ম্যান্ডেট বিতর্কে নতুন সঙ্কট
নিজস্ব প্রতিবেদক:বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন আর কেবল রাজপথের আন্দোলন কিংবা ক্ষমতাবদলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই।গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আইনি রূপরেখা এবং নতুন সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর সাংবিধানিক দ্বিমুখী দ্বন্দ্ব।এক দিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের দাবি,গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী গঠন করতে হবে পৃথক ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’।অন্য দিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত নির্বাচিত সরকারের অবস্থান-সংবিধানের রূপান্তর হতে হবে নির্বাচিত সংসদ ও সংসদীয় কমিটির মাধ্যমেই।
আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর বিতর্ক
ক.সংবিধান সংস্কার পরিষদ বনাম ১২ সদস্যের সংসদীয় বিশেষ কমিটি:গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটি গঠনের পর থেকেই এই তর্কের সূত্রপাত। সুপ্রিম কোর্টের শহীদ শাফিউর রহমান অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের সংবাদ সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এই সংসদীয় বিশেষ কমিটির এখতিয়ার নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন।
আইনজীবীদের মূল বক্তব্য হলো,জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ,২০২৫-যা গণভোটের মাধ্যমে সরাসরি জনগণের চূড়ান্ত সমর্থন ও অনুমোদন লাভ করেছে- তার স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দায়িত্ব একটি সুনির্দিষ্ট ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর।সংসদীয় ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রয়াস সেই আদেশের পরিপন্থী এবং আদেশের আংশিক বরখেলাপ।সংবাদ সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন বিশ্লেষকরা সংবিধানে উল্লিখিত ‘ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন,কোনো আইন,অধ্যাদেশ বা রাষ্ট্রপতির আদেশ অসাংবিধানিক কি না,তা নির্ধারণের একমাত্র আইনি এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের বিচার বিভাগের,সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের নয়। সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা রাজনৈতিক ক্ষমতার শক্তিতে কোনো গণভোট-অনুমোদিত আদেশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা বা অকার্যকর করা বিচার বিভাগের বিচারিক পর্যালোচনার ওপর নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের শামিল।
খ. গণভোট ও বৈপ্লবিক আইনি ভিত্তি:আইনজীবীদের যুক্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েই ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার ও সংসদ যে বৈপ্লবিক ও নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল গণভোটে সমর্থিত জুলাই সনদের ম্যান্ডেট।ফলে নির্বাচিত সরকার বা সংসদ যদি নিজেদের সুবিধার স্বার্থে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতাকে অস্বীকার করে,তবে পরোক্ষভাবে সরকার ও সংসদ নিজেদের মূল অস্তিত্ব এবং আইনি ও নৈতিক ভিত্তিকেই বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধতার মুখে ঠেলে দেবে।
রাজনৈতিক অবস্থান ও নির্বাচিত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি
ক. সংস্কার বনাম সংশোধন; জনরায়ের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা :অন্য দিকে সরকারি দল বিএনপির অবস্থান সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক স্মরণসভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করে জানান যে তারা সংবিধানের মূল দর্শনকে পুরোপুরি বদলে ‘পুনর্লিখন বা আমূল সংস্কার’ এর পক্ষে নন; বরং সংবিধানের প্রয়োজনীয় ‘সংশোধন’ এর পক্ষে।
বিএনপির নীতিগত যুক্তি হলো,২০২৬ সালের নির্বাচনে দেশের জনগণ তাদের দলীয় ইশতেহারের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে। ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের কাছ থেকে সরাসরি ক্ষমতা পাওয়া একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংসদেরই সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধনীগুলো চূড়ান্ত করার।
খ. জুলাই সনদের প্রয়োগ ও অনির্বাচিত কাঠামোর আপত্তি : বিএনপি নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে, তারা জুলাই সনদের মূল গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে প্রাক-নির্বাচনী পর্যায় বা অনির্বাচিত কাঠামোর মাধ্যমে কিছু বিতর্কিত প্রস্তাব-যেমন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ কিংবা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা-জনগণের সরাসরি সিদ্ধান্ত ছাড়া চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যার সাথে বিএনপি নীতিগতভাবে একমত ছিল না।
বিএনপির মতে,২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘ ১৮-১৯ বছরের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত পরিণতি। ফলে কোনো নির্দিষ্ট পরিষদের কাছে পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ না রেখে নির্বাচিত সংসদীয় কাঠামোর ভেতর থেকেই সংবিধান সংশোধন সম্পন্ন করা অধিকতর টেকসই ও যুক্তিযুক্ত।
সার্বিক চিত্র ও সঙ্কটের ৩ মূলবিন্দু
বর্তমান প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতির এই নতুন অধ্যায়ে মূলত তিনটি প্রধান নীতিগত
দ্বন্দ্ব উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে :সংসদীয় সার্বভৌমত্ব বনাম গণভোটের ম্যান্ডেট : সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন কি জনগণের সরাসরি রায়ে গঠিত সংসদ (১২ সদস্যের সংসদীয় বিশেষ কমিটি) সম্পন্ন করবে, নাকি গণভোটে অনুমোদিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ চূড়ান্ত রূপ দেবে?
আইনগত বৈধতার ফোরাম : সংসদ কি নিজ এখতিয়ারে ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে অকার্যকর করতে পারে, নাকি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা ছাড়া এই আদেশের ওপর কোনো সাংবিধানিক হাত দেয়া সম্ভব নয়?
রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপ :একপক্ষে আইনজীবী ও সংস্কারবাদীদের দাবি ‘জুলাই সনদের পূর্ণ আইনি রূপায়ণ ও বাস্তবায়ন’অন্য দিকে নির্বাচিত সরকারের দাবি ‘সংসদীয় প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী ইশতেহার-ভিত্তিক সংবিধান সংশোধন।’
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত সাংবিধানিক তর্ক এবং সরকারি দলের নীতিগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক অতি-সংবেদনশীল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।এটি আর সাধারণ রাজপথের লড়াই নয়-বরং সংসদীয় সার্বভৌমত্ব বনাম গণভোটের ম্যান্ডেট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক এখতিয়ার সম্পর্কিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই। যদি রাজনৈতিক দলগুলো ও আইনজ্ঞদের মধ্যে একটি গঠনমূলক সমঝোতা তৈরি না হয় তবে সংসদের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর স্থায়ী আইনি বৈধতা বজায় রাখা দুরূহ হয়ে পড়তে পারে, যা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।