শাহজালাল মাজার ঘিরে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের লুটের সাম্রাজ্য
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া :মাজারের ডেক ও দানবাক্স থেকে নগদ টাকা আত্মসাৎ,মানতের একই পশু বারবার বিক্রি, কসাইবাণিজ্য,গিলাফ ও গোলাপজল জালিয়াতিসহ নানা উপায়ে এখানে চলছে লুটপাটের মহোৎসব।পুণ্যভূমি সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট,যারা ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে যুগের পর যুগ কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছে।এমনকি সাধারণ ভক্তদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, দানের টাকায় সুদের ব্যবসা ও পকেটমার চক্রের মাধ্যমে মাজারের ভেতরের পরিবেশকে রীতিমতো নরক গুলজার (মন্দ লোকের আখড়া) বানিয়ে রেখেছে খাদেম ও তাদের সহযোগীদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসন দানবাক্স সিলগালা করে সিসিটিভির নজরদারিতে তা খোলার পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর চিত্র; মাত্র ২৫ দিনেই মেলে ৬৪ লাখ টাকারও বেশি নগদ, সঙ্গে ১২ দেশের মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও ৬৫টি ছাগল। মাজার জিম্মি করে রাখা এই সিন্ডিকেটের অন্ধকার সাম্রাজ্য উন্মোচিত হয়েছে যুগান্তরের অনুসন্ধানে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন,মাজারে দীর্ঘদিন ধরে টাকা-পয়সার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব রাখার নিয়ম ছিল না।টাকা কোথায় যাচ্ছে বা কত জমা হচ্ছে,তা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারতেন না।এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার জন্য সম্প্রতি দানবাক্সগুলো সিলগালা করা হয়েছে।
জানা যায়,প্রায় ৭০০ বছর ধরে চলা মাজারের দানবাক্সগুলোতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ছিল না।এই সুযোগে দানের অর্থ সরাসরি বস্তায় ভরে মাজারের প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত।এ নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হলে ১৮ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসন মাজারের তিনটি ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে দেয়।
২২ জুন ইতিহাসে প্রথমবার মাজারের ডেক ও দানবাক্স সর্বসাধারণের সামনে,সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে খোলা হয়। এতে ৪ দিনের সংগ্রহ দাঁড়ায় নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা।প্রথম গণনার ১৯ দিন পর ১১ জুলাই পুনরায় দানবাক্স ও ডেকগুলো খুলে অর্থ গণনা করা হয়।এবার পাওয়া যায় নগদ ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা।এছাড়াও ১২টি দেশের বিপুল পরিমাণ মুদ্রা,স্বর্ণালংকার,চমকপ্রদ চিঠি ও রহস্যময় চিরকুট পাওয়া যায় দানবাক্সে।শুধু তাই নয়,মাজারে আসে মানতের ৬৫টি ছাগলসহ গবাদিপশু।
স্থানীয় আহমেদ ফয়সাল জানান,দুদফায় ২৫ দিনের দানের টাকার হিসাবই বলে দেয়,যুগের পর যুগ ধরে এখানে কী পরিমাণ অর্থ লুট হয়েছে।তিনি বলেন,ডেক ও দানবাক্সগুলো সিলগালা করার পর দানের টাকা কম দেখাতে অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন মাজারসংশ্লিষ্টরা।দানবাক্সে যাতে মহিলারা টাকা ফেলতে না পারেন সেজন্য মাজারের কেরানি সামুন মাহমুদ খানের ইশারায় মহিলা ইবাদতখানা বন্ধ রাখা হয়েছে।
কুমিল্লা থেকে আসা শাহেরা খাতুন জানান,দানবাক্সে টাকা কম দেখাতে দরগার দেওয়ান নামধারী কেরানি জহুর উদ্দির রশীদ দানের টাকা হাতে হাতে নিচ্ছেন।চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকে আসা রিনা খানম জেবা বলেন,মাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয়ভাবে খুবই প্রভাবশালী।মাজারের দানের টাকার স্বচ্ছতা আনা এবং দখলদারত্ব ও অপকর্ম বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমকে সিলেট ছাড়তে হয়েছে।
এ বিষয়ে সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম বলেন,আমরা যখন প্রথমবার(২২ জুন)দানের টাকা গুনছিলাম, তখনো হয়তো ৪০-৪৫ ভাগ টাকা পেয়েছি।বাকি টাকা তারা (মাজারের লোকজন) নগদ হাতে হাতে নিয়েছেন।আর ১১ জুলাই ২০-২৫ ভাগ টাকা পাওয়া গেছে। বাকি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।তিনি বলেন,মূলত টাকাটা ওঠে কবরস্থানের পাশের ঝরনা এলাকা থেকে।সেখানে তারা হাতে হাতে টাকা নেন।যারা টাকা নেন তারা ভক্তদের স্পষ্টই বলেন,আপনারা যদি মাজারকে দিতে চান তাহলে আমাদের কাছে দেন,আর যদি সরকারকে দিতে চান তাহলে এই বক্সের মধ্যে ফেলেন।এই কারণে দানবাক্স ও ডেকে টাকাটা কম এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে,মোতাওয়াল্লি ও খাদেমদের আয়ের মূল উৎস মাজারের সম্পত্তি(মার্কেট,দোকানপাট ও পুকুর) ও ডেক-দানবাক্সের টাকা।এর বাইরে বড় অঙ্কের লেনদেন হয় ব্যক্তিগত নজরানায়।শীর্ষস্থানীয় ভিআইপি ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ,বিশেষ করে যুক্তরাজ্য,যুক্তরাষ্ট্র ও মধপ্রাচ্য প্রবাসী ভক্তরা যখন মাজারে আসেন,তারা মাজারের জন্য খাদেমদের হাতে লাখ টাকা বা বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণ তুলে দেন।কিন্তু এসব টাকা বা স্বর্ণালংকার তারা মাজারে না দিয়ে নিজেরাই আত্মসাৎ করেন।বাৎসরিক ওরশের সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্তদের কাছ থেকে গরু,মহিষ ও বিপুল নগদ অর্থ আদায় হয়।এগুলোও খাদেমদের বিভিন্ন উপ-গ্রুপের মধ্যে বণ্টন করা হয়।শুধু তাই নয়,দেশের বিভিন্ন স্থানে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের নামে দানবাক্স চালু আছে।
এসব দানবাক্স থেকে যেসব টাকা উঠছে সেগুলোও ভাগবাঁটোয়ারা হচ্ছে সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে।এছাড়া পশু মানতের উদ্দেশে মাজারে এসে কেউ কেরানি সামুন বা তার সহযোগীদের সহায়তা চাইলে নিয়ে যাওয়া হয় সামুনের গোয়ালঘরে। সেখানে মূলত মানতের গরু-ছাগল থাকে,যেগুলো আগে থেকেই ভক্তরা দান করেছেন।সেখান থেকেই বিক্রি করা হয় নতুন মানতের পশু।এভাবে একটি গরু বা ছাগল সাতবার পর্যন্ত বিক্রি করা হয়।
জানা গেছে,মাজারে প্রায় ৫০০ খাদেমের একটি বড় অংশ গড়ে তুলেছে অপরাধ নেটওয়ার্ক।খাদেমের মধ্যে মুরুব্বি হলেন ৩০ জন। কেরানি সামুন মাহমুদ খান ও খোকন ওরফে বকরি খোকনের আশীর্বাদে এই ৩০ জন মাজারের দৈনিক আয়ের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।প্রতিদিন ফজর থেকে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত নির্দিষ্ট একজন খাদেমের ‘বারি’ বা ডিউটি নির্ধারণ করা থাকে।এই ২৪ ঘণ্টার বারি চলাকালে মাজারের বিভিন্ন খাত থেকে গড়ে ৪-৫ লাখ টাকা নগদ সংগৃহীত হয়।
বৃহস্পতিবার,শুক্রবার কিংবা ছুটির দিনে ভক্তদের ঢল নামলে দৈনিক আয় ১০ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এই আয়ের সিংহভাগ বারি পাওয়া খাদেম ও সিন্ডিকেটের মূল হোতারা ভাগ করে নেন।কোনো সাধারণ খাদেম যদি সাময়িক অর্থকষ্টে ভোগেন,তবে খোকন তার ফান্ড থেকে দানের টাকা ধার দেন,যা পরবর্তী বারি পাওয়ার পর চড়া সুদে কেটে নেওয়া হয়। এই চক্রের মাধ্যমে সাধারণ খাদেমদেরও একপ্রকার দাসত্বে বন্দি করে রাখা হয়।
সামুন ও খোকন সিন্ডিকেটের অন্যতম বিশ্বস্ত ৪ জন দুর্ধর্ষ অপরাধী রয়েছে।তারাই মাজারের সার্বিক অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করে।এরা হলেন-মনি,কুতুব,বাবুল ও মিলন।এদের নেতৃত্বে মাজার প্রাঙ্গণে পকেটমার,ছিনতাইকারী ও জুতাচোর সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।মাজারের ভেতর সংঘটিত চুরি,ছিনতাই ও পকেটমার থেকে দৈনিক যে লাখ লাখ টাকা আয় হয়,তার একটি বড় অংশ সরাসরি সামুন ও খোকনের পকেটে চলে যায় পার্সেন্টেজ হিসাবে।
অমানুষিক নির্যাতন: মাজারে রয়েছে জোরপূর্বক অর্থ আদায় এবং সাধারণ মানুষের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের এক রোমহর্ষক অধ্যায়। এই নির্যাতন প্রক্রিয়ার মূল হোতা মাজারের প্রভাবশালী হেড বাবুর্চি সোহেল। তার অধীনে রয়েছে ফয়েজসহ কয়েকজন। মাজারে আসা কোনো সাধারণ মানুষ যদি এই সিন্ডিকেটের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, তবে তাকে ‘জুতাচোর’ বা ‘মোবাইল চোর’ সাব্যস্ত করে চক্রের সদস্যরা। পরে ওই ব্যক্তির পরিবারকে খবর দিয়ে থানা-পুলিশের হাত থেকে বাঁচানোর আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়।
মানতের পশু নিয়ে বাণিজ্য: মানতের গরু জবাইয়ের পর মাংস রান্না করা বাবদ বাবুর্চির বিল দুই হাজার টাকা এবং খাসির ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা নেওয়ার বিধান রয়েছে।কিন্তু গরুতে ১০ থেকে ১৮ হাজার টাকা এবং খাসিতে নেওয়া হয় দুই থেকে তিন হাজার টাকা।এছাড়া গরু-খাসির মাংস,মাথা,ভুঁড়ি,চামড়া ও পা নিয়ে যান বাবুর্চিরা।পশুর চামড়া ছাড়ানোর সময় সিন্ডিকেটের কসাইরা সুকৌশলে চামড়ার গায়ে ১০ থেকে ১৫ কেজি আস্ত মাংস রেখে দেন। এছাড়াও কয়েকটি ধাপে মাংস গায়েব করা হয়।ফলে একটি গরুর তিন ভাগের এক ভাগও রান্না করা হয় না।এছাড়া শিন্নি পাকের পর অর্ধেকই নিয়ে যান বাবুর্চিরা।
গিলাফ ও গোলাপজল জালিয়াতি: মাজারের ভক্তরা গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে দামি গিলাফ ও গোলাপজল কিনে আনেন। ভক্তরা মাজার প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার পরপরই খাদেমরা তা সরিয়ে ফেলেন।পরে সেই একই গিলাফ ও গোলাপজল পুনরায় মাজারের সামনের নির্দিষ্ট দোকান কিংবা অন্য ভক্তের কাছে নতুন করে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।
তদন্ত কমিটি:সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন,আমি জেলা প্রশাসক হিসাবে রোববার(১৩ জুলাই) যোগদান করেছি। মাজারের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।ওই কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।প্রতিবেদন পাওয়ার আগে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।
মোতাওয়াল্লির বক্তব্য: মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন,মাজারে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে ‘যুদ্ধংদেহী মনোভাব’ নিয়ে যেভাবে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে বা ডেক ও দানবাক্স সিলগালা করা হয়েছে,তা অনভিপ্রেত।তিনি বলেন,মাজারের নিজস্ব শৃঙ্খলা রক্ষায় চৌকিদাররা সব সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।পকেটমার ও প্রতারকদের সব সময় প্রতিহত করা হচ্ছে।
দুদকের বক্তব্য:দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ বলেন,বেশ কিছুদিন ধরে দুদকে কমিশন(চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার)নেই।কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আমরা বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে পারি না।মাজারের বিষয়টি নিয়ে আমরা আন-অফিশিয়াল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি।কমিশন গঠনের পর অনুমতি পাওয়া গেলে এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করা যাবে।