বিরোধী দলের ওয়াকআউট,সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি
নুর নবী জনী : বিরোধী দলের সদস্য ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার রাতে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধান করে ১২ সদস্যের এ কমিটি গঠন করা হয়।সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করায় এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে এ কমিটি পাশ হয়। তবে বিরোধী দলের জন্য ৫টি পদ শূন্য রাখা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে সদস্য দেবে না বলে সংসদে জানিয়েছে বিরোধী দল।
বিশেষ কমিটির সদস্যরা হলেন-চিফ হুইপ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বিএনপির সংসদ সসদ্য জয়নুল আবেদীন (বরিশাল-৩), পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ও গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ-সদস্য জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বিজেপির সংসদ-সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি মো. নুরুল হক, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, বিএনপিদলীয় সংরক্ষিত আসনের এমপি শাকিলা ফারজানা, বিএনপির মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল (শেরপুর-৩) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ-সদস্য মো. অলি উল্লাহ। ডেপুটি স্পিকার কমিটি গঠনের বিষয়টি ভোটে দিলে তা কণ্ঠভোটে পাশ হয়।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম সংসদ নেতার পক্ষে সংসদে এ কমিটির নাম প্রস্তাব করেন। এর আগে চিফ হুইপ বলেন, বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা হলেও তারা কোনো সদস্যের নাম দেননি। তাই আপাতত পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। পরে বিরোধী দল নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। সংবিধান সংশোধনে এ কমিটি সুপারিশ করবে।
এদিকে কমিটির নাম প্রস্তাবের পরপরই বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, এ বিষয়টা প্রথম অধিবেশন থেকেই চলে আসছে। প্রথম অধিবেশনেই আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট ব্যক্ত করেছি। এটা ঠিক যে, কয়েক দফায় চিফ হুইপ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, বসেছেন। আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি। কখনো বলিনি যে, আমরা সদস্যদের নাম দেব। আমরা ধারণাগতভাবেই এটাকে গ্রহণ করিনি। আমরা জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ, যেমন ওয়াদাবদ্ধ ছিল বর্তমান সরকারি দল। আমরা নির্বাচনের আগে সবাই বলেছি গণভোটে হ্যাঁ বলুন। হ্যাঁ বিজয়ী হলে আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করব এবং এরই প্রেক্ষিতে আমরা দুইটা শপথ নিয়েছি। একটা সংসদ-সদস্য হিসাবে আরেকটা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে। আমাদের দুইটা শপথই মনে করি বিদ্যমান আছে। সুতরাং ওইটাকে বাইপাস করার জন্য যদি এই কমিটি গঠন করা হয় তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা আমাদের আগের অবস্থানেই আছি।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি গণতন্ত্রের দাবি হচ্ছে জনগণের মতামতকে মেনে নেওয়া। সেই মতামত ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। এই মতামত যদি এভাবে অবলীলায় শেষ হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক এই পদ্ধতির ওপর জনগণ আস্থা হারাবে। জনগণের এই অভিপ্রায় মতামতকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য, অপমান করা উচিত হবে না। জনগণের প্রতি সম্মান রেখেই আমরা শুধু এই কমিটি গঠন প্রত্যাখ্যান করছি। শুধু এটাই নয়, এর প্রতিবাদে আমরা ওয়াকআউট করছি। ৯টা ২৫ মিনিটে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে চলে যাওয়ার পর তাদের ডেপুটি স্পিকার সরকারি দলের বক্তব্য শোনার আহ্বান জানালেও তারা সাড়া দেননি।
বিরোধী দল ওয়াকআউট করে চলে যাওয়ার পর ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বিরোধী দলের দুটি শপথ নেওয়াকে সাংবিধানিকভাবে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুসারে নির্বাচন ও এই সংসদ গঠিত হয়েছে। এখনো পর্যন্ত সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে সেই ধারাবাহিকতায় এই জাতীয় সংসদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কাজেই তারা যদি বলে থাকে তারা দুইটা শপথ নিয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ, সেটা অসাংবিধানিক।
তিনি বলেন, গণভোটের গণরায়কে সম্মান দিতে হলে এই সংবিধানকে সংস্কার, সংশোধন করতে হবে এবং তারপর যদি সবাই মিলে রাজি হয় যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হবে। তখন যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নিতে পারবে তখন সেটা হবে। এখন তো সেটা হয়নি। আগে সংবিধান সংশোধন হতে হবে। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে যদি সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান সংবিধানে সংযুক্ত করতে হয় সেই আলোচনাও তাদের সেই সংবিধান সংশোধন কমিটিতে এসে করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এখন যদি কেউ বলে যে গণভোট কিসের ওপর হয়েছে মাননীয় স্পিকার? গণভোটের যে আদেশ সেটাকে আমরা নাম দিয়েছি জুলাই আদেশ। যেই আদেশটা প্রথম দিন থেকে এখতিয়ারবহির্ভূত। এটা ফ্রড অন দি কনস্টিটিউশন। জাতীয় জুলাই বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ নামে যেটা করা হয়েছে রাষ্ট্রপতি সেটা করতে পারেন না।
মন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধন না করে আমরা বসে থাকতে পারব না। সংবিধান সংশোধন না হলে শেখ হাসিনা প্রদত্ত পঞ্চদশ সংশোধন নিয়েই চলতে থাকবে। আমরা কি তা চাই? এই সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা বৈঠক করব। সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করব। আমরা আশা করি বিরোধী সদস্যরা ইমোশনাল রাজনীতি না করে, সংশোধিত একটি শক্তিশালী সংবিধান সংশোধনে আনতে পারি সেজন্য গণতন্ত্রের স্বার্থে তারা সহযোগিতা করবে।
মন্ত্রী বলেন, কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক, বিভিন্ন অংশীজন এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। সংসদেও এ বিষয়ে আলোচনা হবে। পরে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর কমিটি ভোটে দেওয়া হলে কণ্ঠভোটে পাশ হয়। তবে বিশেষ কমিটির কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।