আর্থিক সংকটে কাটছাঁট হচ্ছে নবম পে-স্কেল
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:আর্থিক সংকটের কারণে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া পে-স্কেলের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়নের সুযোগ দেখছে না সরকার।বিশেষ করে বিভিন্ন গ্রেডের মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ কয়েকটি ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।রাজস্ব আয়ের চাপ, বাজেট ঘাটতি, ঋণ পরিশোধের দায় এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় প্রস্তাবিত কাঠামোয় কিছু কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। দুই অর্থবছরে সর্বোচ্চ তিন ধাপে এটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে। চলতি অর্থবছরে মূল বেতন, আগামী অর্থবছরে দুই ধাপে ভাতাগুলো কার্যকর করা হতে পারে। আগামী অর্থবছরের শুরুতে বাড়িভাড়া এবং দ্বিতীয়ার্ধ অর্থাৎ জানুয়ারিতে ভাতাগুলো কার্যকর করা হতে পারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেড ১১-২০ পর্যন্ত মূল বেতন এবং ভাতা বেশি বাড়বে এবং ১ থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত বেতন ও ভাতা কম বৃদ্ধির সুপারিশ করবে সচিব কমিটি। এর আগে সর্বোচ্চ ১০০-১৪২ ভাগ পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে আর্থিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে নবম পে-স্কেল সুপারিশ শতভাগ বাস্তবায়ন না করার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
যদিও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নে সফটওয়্যার, হিসাবরক্ষণ, পেনশন পুনর্নির্ধারণ এবং বেতন সমন্বয়ের মতো কিছু প্রযুক্তিগত জটিলতা রয়েছে। এসব সমস্যা কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়েও কাজ করছে সচিব কমিটি। এরই মধ্যে সচিবালয়ে সোমবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে-পে-স্কেলের বিষয়টি তড়িঘড়ি নয়; বরং নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এগিয়ে নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি জুলাই মাসের শেষ নাগাদ সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে পারে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং সবশেষে গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়েই কার্যকর হবে নবম পে-স্কেল।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, পে-স্কেল নিয়ে অযথা তাড়াহুড়া করার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়বদ্ধতার বিষয়। ফলে প্রতিটি সুপারিশের আর্থিক প্রভাব, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং আইনগত দিক যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, চলতি মাসের শেষ নাগাদ সচিব কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে চায়। এর আগে আরও দুটো বৈঠক করবে সচিব কমিটি। এসব বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত, আর্থিক সক্ষমতা, বাস্তবায়ন কৌশল এবং ধাপভিত্তিক কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এরপর বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। ভেটিং শেষ হওয়ার পরই সরকার নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
এদিকে নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার পরও গেজেট না হওয়ায় নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সরকার পে-স্কেল কার্যকরে পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি বিলম্ব নয়; বরং একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। সূত্র জানায়, সরকারের নীতিগত অবস্থান হলো-নবম পে-স্কেল কার্যকর ধরা হবে ১ জুলাই থেকে। ফলে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হলে ওই তারিখ থেকেই বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সমন্বয় করা হবে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি একদিকে যেমন জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় সহায়ক হবে, অন্যদিকে সরকারের জন্যও এটি একটি বড় আর্থিক দায় তৈরি করবে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হতে পারে।