১ লাখ টাকায় ডিবি হারুনের আড়াই বিঘা জমি - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় বিআইডব্লিউটিএ গনভোট নিয়ে জাতির সাথে বেইমানি করলে বর্তমান সরকারের পরিনত হবে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের মত বরিশালে হলুদ অটোরিকশার ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ে অতিষ্ঠ যাত্রীরা নলছিটির রানাপাশা ইলেন ভুট্টো সড়কে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ‘মশা মারতে শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর ভরসা করলে বিপদ বাড়বে’ বেসরকারি খাত বেশ কয়েক বছর ধরে নানা সংকটে নিমজ্জিত দেশের ৯ জেলায় ঝড়ের পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সতর্কবার্তা মরহুম মাওলানা আবুল হাশেমের সহধর্মিনীর চিকিৎসার খোঁজ নিলেন জেলা জামায়াতের আমির দলীয় এমপিদের প্রতি জামায়াতের সতর্কবার্তা যোগসাজশে লুটপাট চোরে খাচ্ছে মিটার,৩০ পৌরসভায় পানি সরবরাহ প্রকল্প

১ লাখ টাকায় ডিবি হারুনের আড়াই বিঘা জমি


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে গরিব মানুষের প্রায় ১২১ বিঘা জমি নিজের আয়ত্তে নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ গড়ে তোলেন প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট।প্রভাব খাটিয়ে এ জমির মালিককে মাত্র ১ লাখ টাকা ধরিয়ে দিয়ে জমির দলিল করে নেওয়া হয়।অনুসন্ধানে হারুনের ক্ষমতার তাণ্ডবে অবৈধ সম্পদ ও অবিশ্বাস্য দলিলকাণ্ডের বিষয়টি বেরিয়ে আসে।রিসোর্টের জন্য নেওয়া ওই জমির মূল্য প্রায় ৭ কোটি ২৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। কিন্তু জমির মালিকরা এ টাকা পাননি।তাদের চরমভাবে ঠকানো হয়েছে। এর মধ্যে রিসোর্টের স্থাপনা রয়েছে প্রায় আড়াই বিঘা জমির ওপর।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যে কজন দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন তাদের মধ্যে তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদের পরেই ছিল ডিআইজি হারুন অর রশীদের প্রভাব। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের এসপি থাকাকালীন অসংখ্য মিল-ফ্যাক্টরির মালিককে হয়রানির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। নারায়ণগঞ্জে বিএনপি পরিবারের এক ব্যবসায়ী পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগে তাকে প্রত্যাহারও করা হয়। ওই ঘটনায় তিনি কান্নাকাটি করে সাংবাদিকদের কাছে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন। সবার ধারণা ছিল, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তাতে তিনি বিভাগীয় শাস্তির মুখে পড়বেন। কিন্তু না। তিনি আরও শক্তি সঞ্চয় করে ডিএমডির তেজগাঁও জোনের ডিসি এবং পরে ডিআইজি হিসাবে পদোন্নতি পেয়ে ডিবির প্রধান পদে পোস্টিং পান। তখন থেকে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সরকারবিরোধী মতের লোকজনকে ডিবির বন্দিশালায় রেখে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ডিবিপ্রধান হিসাবে ভাতের হোটেল কালচার ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ছয়জন সমন্বয়ককে ধরে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে তাদের মুখ থেকে মিথ্যা ঘোষণা আদায়ের চেষ্টা করেও তিনি সমালোচিত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে ডিএমপিতে যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক বলয় ও প্রভাব তৈরি করে বেনজীরের মতো হারুনও ধীরে ধীরে দুর্নীতির ডালপালা বিস্তার করেন। রাষ্ট্রীয় একটি বাহিনীর পোশাক ব্যবহার করেছেন মানুষের অধিকার হরণ আর দুর্নীতি-লোপাটের কাজে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ থাকায় হারুন হয়ে পড়েন বেসামাল। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ ছাড়েন তিনি। তদন্ত দপ্তরগুলোর কাছে অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি ও পাচারের টাকায় তিনি তার স্ত্রী-সন্তানকে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে ‘সেটেল’ করে রাখেন। পদপদবির ক্ষমতা বিস্তার করে দেশেও গড়ে তোলেন বিপুল সম্পদ। দুদক থেকে হারুন, তার স্ত্রী ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলাও হয়েছে। সেসব মামলার তদন্ত চলমান। দেশের বাইরে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট বিএফআইইউ।

অনুসন্ধানে ঢাকা ও কিশোরগঞ্জে হারুনের শতকোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ার তথ্য বেরিয়ে আসে। এনবিআর ও দুদকের তদন্ত এখনো চলমান। হারুন কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ২০১৮ সালে শুরু করেন প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট তৈরির কাজ। ২০২০ সালে উদ্বোধন করেন। কাগজে-কলমে রিসোর্টের মালিকানা দেখানো হয় হারুনের মা, এক ভাই ও স্ত্রীকে। প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রো লিমিটেডের চেয়ারম্যান করা হয় হারুনের মা জহুরা খাতুনকে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয় তার ভাই এবিএম শাহরিয়ারকে। তার মা একজন গৃহিণী। ভাই শাহরিয়ার ২০১৯ সালে হলিফ্যামিলি হাসপাতাল অ্যান্ড কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। ওই সময়ে ৩৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে রিসোর্ট করার মতো অবস্থানে তিনি ছিলেনও না। ফলে রিসোর্টের সমুদয় অর্থের উৎস নিয়ে তখনো অনেকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়।অন্যদিকে, এই রিসোর্ট তৈরির জন্য হারুন তার প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় অসংখ্য নিরীহ মানুষের জমি নেন। কিন্তু কোনো জমির মালিককেই ন্যায্যমূল্য দেননি। কেউ তখন ভয়ে এ নিয়ে মুখ খুলতেও সাহস পাননি। তবে অনেকেই বলেছেন, পদে থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে রিসোর্ট গড়ে তোলার ঘটনা দেশে নজিরবিহীন।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, হারুন মিঠামইন উপজেলার সদর ইউনিয়ন ও আশপাশে হাওড় এলাকায় প্রায় ৪০ একর বা ১২১ বিঘা জমি নিজের আয়ত্তে নেন। নকশা অনুযায়ী রিসোর্টের মূল স্থাপনা রয়েছে প্রায় আড়াই বিঘা জমির ওপর। এই জমির দলিলমূল্যে চোখ আটকে যায়। মাত্র ১ লাখ টাকায় আড়াই বিঘা জমি! হারুন যে ১২ জন স্থানীয় বাসিন্দার জমি নিয়েছেন তাদের একজন জানান, আমরা তখন ভয়ে কিছু বলতে সাহস পাইনি। হাতেগোনা কয়টা টাকা দিয়ে আমাদের বিঘার পর বিঘা জমি নিয়ে গেছেন (হারুন) তিনি। বাস্তবে ওই জমির বাজারমূল্য বহুগুণ বেশি। কিন্তু পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের আত্মীয় পরিচয় থাকায় কোনো জমির মালিক তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস পাননি। মিঠামইন উপজেলার সদর ইউনিয়নের গিরিশপুর গ্রামের বাসিন্দা দিলীপ কুমার বণিক জানান, দরদাম ঠিক না করেই তার এক একর দশ শতাংশ জমি নিয়েছেন হারুন। তাকে এ জমি বাবদ মাত্র ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাজারমূল্য হিসাবে তাকে দেওয়ার কথা কম হলেও ২০ লাখ টাকা। তিনি বলেন, ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা আমাকেই ঠকানো হয়েছে। আমার মতো আরও ১২ জন আছেন এভাবে সামান্য কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাদের জমিও নিয়েছেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের (সরকারি) হিসাবে মিঠামইনে গড়ে তোলা প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রো লিমিটেডে হারুনের বিনিয়োগ ৩৫ কোটি টাকা। তদন্ত শেষে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। তাতে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বাস্তবে ওই রিসোর্টে বিনিয়োগ প্রায় ৫০ কোটি টাকা হবে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা।এদিকে, উত্তরায় ৩নং সেক্টরের ২০নং সড়কের ২৬/কে হোল্ডিংয়ে সাড়ে ৮ কাঠা জমির ওপর হারুন ও তার স্ত্রী শিরিনের নামে তৈরি অত্যাধুনিক বাড়িটি করা হয়েছে কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকায়। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের হিসাবে বা সরকারি মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র সাড়ে ৬ কোটি টাকা। ওই বাড়ির প্রতিটি ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য এখন ৩ কোটি টাকার মতো।

২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর দুদক থেকে হারুন, তার ভাই ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রায় ৪১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা করা হয়। অভিযোগ থেকে দেখা যায়, হারুনের বিরুদ্ধে ১৭ কোটি, তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ১২ কোটি ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে ১২ কোটি টাকার দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয় মামলায়। তদন্তে দুর্নীতির অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানান দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে মামলা করা হয়েছে। তদন্তকালে সব স্থাবর-অস্থাবর ও অবৈধ সম্পদের তথ্য বের হবে। তদন্তে হারুনের মায়ের নামেও ২ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য মিলেছে। বাস্তবে এই অঙ্ক আরও বেশি হবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক জয়নুল আবেদীন জানান, সাবেক ডিআইজি হারুনের বিদেশে সম্পদের বিষয়ে কাজ করছে বিএফআইইউ। দুদকের তদন্ত শেষে হারুনসহ তার পরিবারের অপরাপর সদস্যদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হবে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে সাবেক ও বর্তমান মিলে যে ৯৫২ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি ডিবির তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ। সারা দেশে তার বিরুদ্ধে ১৭১টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।

Top