একটি অকার্যকর মানবাধিকার কমিশন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে তা সরকারের জন্যই আত্মঘাতী হবে
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:একটি অকার্যকর মানবাধিকার কমিশন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে তা সরকারের জন্যই আত্মঘাতী হবে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে টিআইবি আয়োজিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের ২০২৬ (খসড়া) পর্যালোচনা ও সুপারিশ শীর্ষক পরামর্শ সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। এতে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।তিনি বলেছেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী বিষয় নয়। বর্তমানে যারা ক্ষমতায় তারা নিশ্চয়ই তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে যাননি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ইফতেখারুজ্জামান তার পর্যালোচনা ও সুপারিশসংক্রান্ত লিখিত উপস্থাপনায় বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের-২০২৬ খসড়া আইনে যেসব ধারা যুক্ত করা হয়েছে তাতে মূলত নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক কমিশনকে করায়ত্তের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যা প্রকৃত স্বাধীন ও কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘকাল লালিত জনপ্রত্যাশার পরিপন্থি।
খসড়া আইন পর্যালোচনা করে ২২টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ সভায় তুলে ধরেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত না হলে সরকার প্রমাণ করবে যে দেশে স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠায় তাদের সদিচ্ছা নেই। তবে ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি, নির্বাচনি ইশতেহার ও জুলাই সনদ পালনের যে অঙ্গীকার বিএনপি করেছে, তা যথাযথভাবে পালন করলে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে যারা ব্যর্থ হয়, তারা আত্মঘাতী অবস্থায় যায়। নিজেদের জন্য ‘ফ্র্যাংকেনস্টাইন’ তৈরি করে। কারণ, আজ যে প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবে প্রভাবিত করা হবে, সেই প্রতিষ্ঠানের অকার্যকরতার যে নেতিবাচক ফলাফল হয়, তার ভুক্তভোগী কিন্তু তারাই হবেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পৃথিবীতে এর চেয়েও অনেক বেশি কর্তৃত্ববাদী সরকার রয়েছে। কিন্তু সেখানেও হয়তো রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এভাবে দলীয়করণ করা হয় না।
খসড়ার বিভিন্ন ধারা সংশোধনের সুপারিশ তুলে ধরে বলা হয়, প্রস্তাবিত খসড়া আইনে কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে যা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন থাকবে না-এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে। এছাড়া সব আইন প্রয়োগকারী, গোয়েন্দা ও নজরদারি সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল, যেখানে গুমসহ বিভিন্ন নির্যাতনের জন্য আটক ব্যক্তিদের রাখার সম্ভাবনা রয়েছে এমন স্থানগুলোর নিয়মিত অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্ত করা। এরূপ স্থান ও অবস্থান উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা এবং এসব স্থান আইনবহির্ভূত হলে তা বন্ধ করা ও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে সুপরিশের বিধান যুক্ত করতে হবে।
খসড়ার ২০ ধারা বাতিল করে কমিশনকে শৃঙ্খলা বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা এবং শাস্তির পরিমাণ, ক্ষতিপূরণ বা প্রশাসনিক আদেশ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ প্রদানের ক্ষমতা সংবলিত বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রস্তাবিত খসড়া আইনের ১৬ ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হলে তাকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বা ক্ষেত্রমতে কমিশনের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না-এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে।