‘সুপারিশের’ বিড়ম্বনায় ফায়ার সার্ভিস কর্তারা,নিয়োগে সব ধাপে কড়াকড়ি
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে চলিত বছর ফায়ার ফাইটারসহ বিভিন্ন পদে ২৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে।নানামুখী তৎপরতায় অযোগ্য প্রার্থীরা বিভিন্ন ধাপে সহজেই বাদ পড়ে যাচ্ছেন। ফলে তাদের নির্বাচিতের তালিকায় রাখতে একদিকে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রশাসনিক উচ্চপদস্থরা সুপারিশ করছেন, অন্যদিকে অর্থিক লেনদেনে তৎপর হয়ে উঠছে সংঘবব্ধ চক্র। তবে দ্রুত ফলাফল তৈরি এবং একই দিনে তা প্রকাশের কারণে তাদের চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বাছাইপর্ব। নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচলে বৃহস্পতিবার থেকে চলছে শারীরিক যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষা। এবার প্রার্থী বাছাইয়ে কঠোর হওয়ায় ‘সুপারিশের বিড়ম্বনায়’ পড়েছেন ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে পরীক্ষার দিনই ফল প্রকাশসহ যোগ্যতা যাচাইয়ের ধাপগুলোয় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এরপর লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে প্রার্থী।
জানা যায়, প্রতিবার ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় সক্রিয় হয়ে উঠে চক্রের সদস্যরা। তাদের একটি দল বাদ পড়া প্রার্থীদের প্ররোচিত করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এছাড়া প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার চুক্তিতে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে।
এসব চক্রে বাহিনীর সদস্যদেরও যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এবারও এমন একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। সম্প্রতি ওই নম্বর থেকে মাঠ পরীক্ষায় নির্বাচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরোনো কায়দায় অর্থ দাবি করা হচ্ছে। নম্বরটি প্রকাশ করে ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করেছে বাহিনী। একই সঙ্গে চক্রের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। কাজ করছেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও। এছাড়া প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সচেতন করা হচ্ছে।
এদিকে বুধবার সকালে সরেজমিন নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচলে অবস্থিত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মাল্টিপারপাস ট্রেনিং গ্রাউন্ডে গিয়ে দেখা যায়, ময়মনসিংহ জেলার প্রার্থীরা উপস্থিত হয়েছেন। তাদের শারীরিক যোগ্যতা যাচাইয়ের ৭টি ধাপে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। প্রথমে জেলাভিত্তিক প্রার্থীদের প্রবেশপত্র দেখে ২০ জন করে নিয়ে আসা হচ্ছে। এরপর অন্যান্য কাগজপত্র, ওজন, বুকের মাপ ও উচ্চতা যাচাই করা হয়। সব ঠিক থাকলে তাদের ২০ জনের গ্রুপে ১ মিনিট ১০ সেকেন্ডে ৪০০ মিটার দৌড়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। এরপর ১৫টি পুশআপে সক্ষমদের মেডিকেল চেকআপ করা হয়। পরে ছবি তোলা ও ফলাফলের জন্য ডেটা এন্ট্রি করা হয়। একই দিন ওয়েবসাইট ও ফেসবুকে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এসব ধাপে অযোগ্য প্রার্থীদের চিহ্নিত করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, এবার ২৪ হাজার জন আবেদন করেছেন। এখান থেকে ২০০ জন ফায়ার ফাইটার নিয়োগ দেওয়া হবে। আর ড্রাইভারসহ অন্যান্য পদে নেওয়া হবে ৪২ জন। শারীরিক পরীক্ষায় নির্বাচিত প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা হবে জুলাইয়ে। পরীক্ষার দিনই ফলাফল প্রকাশ হবে। পরে মৌখিক পরীক্ষা আগস্টে শেষ করে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। সর্বশেষ তথ্যমতে, সিলেট বিভাগ থেকে আবেদন করেছিলেন ৩৭৭ জন, শারীরিক পরীক্ষায় উপস্থিত হয়েছেন ১১৩ জন এবং লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন ২৫ জন। একইভাবে চট্টগ্রাম বিভাগের আবেদনকারী ৯৮৩ জন, উপস্থিত ২২৪ ও নির্বাচিত ৪৪ জন। বরিশাল বিভাগের আবেদনকারী ১ হাজার ৪৪৩, উপস্থিত ৭৮১ ও নির্বাচিত ৭৮ জন। খুলনা বিভাগের আবেদনকারী ২ হাজার ৮২৭ জন, উপস্থিত ৭৮১ ও নির্বাচিত ১৪৭ জন।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, এবার সব ধাপে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে এবং দ্রুত সময়ে ফলাফল প্রস্তুত করা হচ্ছে। এমনকি প্রার্থী বাড়ি ফেরার আগেই তার ফলাফল জানতে পারছেন। এমন পরিস্থিতিতে সুপারিশ করা হলে তারা চাইলেও বাদ পড়া কাউকে যোগ করতে অথবা অযোগ্য কাউকে নির্বাচিত করতে পারছেন না। কিন্তু এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সরকারের বিভিন্ন পদস্থ কর্মকর্তারা সুপারিশ করে তাদের বিড়ম্বনায় ফেলছেন।
বাহিনীটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, শারীরিকভাবে ফিট নন এমন প্রার্থী ফায়ারফাইটার হিসাবে সেবা দিতে পারবেন না। ওই প্রার্থী সুপারিশের মাধ্যমে বা অসদুপায় অবলম্বন করে যোগ দিলে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনী পিছিয়ে পড়বে। এসব বিবেচনায় এবার সব পদে বাছাই প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ে ফলাফল প্রস্তুত করে একই দিন তা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অযোগ্য প্রার্থী সুপারিশ করে অথবা অনৈতিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না।