অস্থিরতার বছরে অর্থ পাচার বাড়ে,পাচার বন্ধে আইন আছে প্রয়োগ নেই
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:দেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা কিংবা অনিশ্চয়তা শুরু হলে দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যায়। আলোচ্য বছরগুলো বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচিত ছিল।অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট বলছে,বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের বেশির ভাগই যায় শীর্ষ দশ দেশে।এসব দেশে কর সুবিধা পাওয়া যায় এবং আইনের শাসন আছে, অপরাধীরা সেসব দেশকেই বেছে নিয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে-সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, হংকং এবং থাইল্যান্ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- অর্থ পাচার ঠেকাতে দেশে শক্তিশালী আইন রয়েছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ নেই।ক্ষমতার সঙ্গে থাকা কিছু রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ী ক্ষমতা হারানোর ভয়ে বিভিন্ন দেশে অর্থ নিয়ে যান। সুইস ব্যাংক, গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে এ তথ্য মিলেছে। বৃহস্পতিবার সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে, আগের বছরের তুলনায় ২০২৪, ২০১৮, ২০১৪ এবং ২০০৭ সালে বাংলাদেশ থেকে এই জমা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে।
জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান শুক্রবার বলেন, সুইস ব্যাংক যে তথ্য প্রকাশ করেছে, সেখানে বাংলাদেশিদের হয়তো কিছু অর্থ বৈধ এবং কিছু অবৈধ আছে। বাংলাদেশের প্রবাসীরা যেসব দেশে কাজ করে, তারা কিছু অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা রাখতে পারে। তবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশিদের আমানতের অঙ্কটা অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, সুইস ব্যাংকের তথ্য ‘হিম শৈলীর চূড়া’ মাত্র। বড় অংশ এখনো অজানা। তার মতে, সুইস ব্যাংক তাদের তথ্য প্রচার করে। এজন্য আমরা জানতে পারছি। এর বাইরেও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, দুবাই, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশের পাচারের টাকা যাচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে সময় পাচারের টাকা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে, সেই সময় সুইস ব্যাংকের এই তথ্য কাম্য নয়। এর কারণ হতে পারে, অন্তর্বর্তী সরকার পাচারের অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ নিলেও পাচারের পথ বন্ধ করতে উদ্যোগ নেয়নি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তিন কারণে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বাড়তে পারে। যেমন দেশে অস্থিরতা কিংবা অনিশ্চয়তা থাকলে টাকা পাচার বাড়ে। ২০২৫ সাল দেশের রাজনীতিতে একটি অস্থিরতা কিংবা অনিশ্চয়তার বছর ছিল। দেশের পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় তা ভেবে অনেকে বিচলিত হয়ে থাকতে পারেন। ফলে ওই সময়ে বিত্তবানদের কেউ কেউ দেশকে নিরাপদ মনে করেনি। দ্বিতীয়ত, অর্থ পাচারের পথ বন্ধ হয়নি। আগে যেভাবে পাচার হতো এখনো সেই পথ চালু আছে। যেমন বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিং বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেই। ওভার ইনভয়েসিং (আমদানিতে পণ্যের মূল্য বেশি দেখানো), আন্ডার ইনভয়েসিং (রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো) চলছে। তৃতীয়ত, পতিত সরকারের যারা কর্ণধার ছিলেন, তারা তাদের সম্পদ বিভিন্নভাবে পাচার করেছেন।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, বাংলাদেশের বৈধ অনুমোদন নিয়ে কেউ সুইস ব্যাংকে টাকা রাখেনি। এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই। তবে অর্থ পাচার ঠেকাতে এবং আগের পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, আইনগতভাবে যা করণীয় তার সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাচারের অর্থ ফেরত আনতে সুইস ব্যাংকের সঙ্গে কোনো এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) হয়নি। তবে অর্থ পাচারের বিষয় নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থা এগমন্ড গ্রুপের সঙ্গে বাংলাদেশের এমওইউ আছে।
সুইস ব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে, ওই বছর বা তার আগের বছর টাকা পাচার বেড়েছে। সর্বশেষ চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। ফলে ওই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে। আলোচ্য বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের আমানতের স্থিতি দাঁড়ায় ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাংক; বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। এরপর ওই বছরের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ নানা কারণে বছরটি অস্থির ছিল। ওই বছর সুইস ব্যাংকে আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশিদের আমানত ৩৩ গুণ বেড়ে স্থিতি হয়েছিল ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ সুইস ফ্রাংক। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে এই আমানত ছিল ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাংক বা ২৬৫ কোটি টাকা। আবার ২০১৮ সালে এগারোতম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর ২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ফ্রাংক। কিন্তু ২০১৮ সালে তা বেড়ে ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঙ্কে উন্নীত হয়। এছাড়া ২০১৪ সালে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগের বছর ২০১৩ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ৩৭ কোটি ১৮ লাখ ফ্রাংক। কিন্তু ২০১৪ সালে অর্থাৎ নির্বাচনি বছরে তা বেড়ে ৫০ কোটি ৬০ লাখ সুইস ফ্রাঙ্কে উন্নীত হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আরেকটি অস্থির বছর ছিল ২০০৭ সাল। বছরটিকে ওয়ান-ইলেভেন হিসাবে ধরা হয়। ওই বছর টাকা পাচার বেড়েছে। ২০০৬ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ১২ কোটি ৪০ লাখ সুইস ফ্রাংক। কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ২০০৭ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণ ২৪ কোটি ৩০ লাখে উন্নীত হয়।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সুইস ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল শেষে দেশটির ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাংক। প্রতি ফ্রাংক ১৫২ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। আর এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এই টাকা অন্তত ৩১টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সমান। আগের বছরের চেয়ে এই আমানত ৪১ শতাংশ বেশি। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। যেখানে এই সময়ে সুইস ব্যাংকে বিশ্বের দেশগুলোর আমানত কমেছে। আন্তর্জাতিক ৬টি সংস্থার রিপোর্টে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য আসছে। এগুলো হলো-জিএফআই, সুইস ব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (আইসিআইজে) প্রকাশিত পানামা, প্যারাডাইস ও পেনডোরা পেপারস, জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ইউএনডিপি) রিপোর্ট এবং মালয়েশিয়া থেকে প্রকাশিত সেদেশের সেকেন্ড হোম রিপোর্ট। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশির অর্থ পাচারের তথ্য মিলেছে। সংস্থাগুলোর রিপোর্টে অর্থ পাচারে শতাধিক বাংলাদেশির নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ, আমলা এবং ব্যবসায়ীদের নেতাদের নাম রয়েছে। তবে সুইস ব্যাংক শুধু আমানতের তথ্য প্রকাশ করেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসনের পতনের পরও অর্থ পাচার থামেনি। তিনি বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কল্যাণে পাচারের প্রক্রিয়া এখন সহজ হয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণে সরকারকে কঠোর হতে হবে। একদিকে পাচার বন্ধ, অপরদিকে আগে পাচার হওয়া টাকা ফেরানো-দুদিকেই জোর দিতে হবে। না হলে এ অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে না।
জানা যায়, অর্থসংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে সরকার এ সংক্রান্ত আইন আধুনিকায়ন করেছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ নামে এটি পরিচিত। বিদ্যমান এই আইনে বিদেশে সম্পদ দ্রুত শনাক্তকরণ, দ্রুত অস্থায়ী জব্দ করা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। আইনের ৪(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি মানি লন্ডারিং বা মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করলে তিনি অন্যূন ৪ বছর এবং অনধিক ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আইনের ১৭(১) ধারায় বলা আছে, এই আইনের অধীন কে কোনো ব্যক্তি বা সত্তা মানি লন্ডারিং অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত দেশে বা দেশের বাইরে অবস্থিত যে কোনো সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিতে পারবে।’ তবে সূত্র বলছে, আইনে এমন বিধান থাকলেও বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত এবং দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে বাস্তবায়নগত নানা জটিলতা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ শুক্রবার বলেন, বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ শুধু সুইস ব্যাংকে যায় না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও যায়। কিন্তু সুইস ব্যাংক তাদের তথ্য প্রকাশ করার কারণে মানুষ জানতে পারছে। অন্যান্য দেশ প্রকাশ করে না। তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। ফলে সরকারের এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে দেখা উচিত। এর সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে টাকা গেল, তা বের করতে হবে। না হলে পাচার বন্ধ হবে না। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে এই সরকার ক্ষমতায় ছিল না। ফলে অর্থ পাচারের বিষয়টি তাদের অনুসন্ধান করতে আপত্তি থাকার কথা নয়।
দেশের আর্থিক খাতের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নে শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে প্রধান করে গঠিত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে; স্থানীয় মুদ্রায় যা ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই পরিমাণ টাকা গত ৫ বছরে দেওয়া দেশের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। আলোচ্য সময়ে প্রতিবছর পাচার হয়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৫ বছরের পাচারের অর্থ দিয়েই ৭৮টি পদ্মা সেতু করা সম্ভব।