আমরা আমাদের নিজেদের চিন্তা কিছুটা পরিবর্তনের চেষ্টা করি
নুর নবী জনী:আমরা আমাদের নিজেদের চিন্তা কিছুটা পরিবর্তনের চেষ্টা করি। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। কিন্তু আপনি এখন প্রতিশোধ নিলেই কি আপনার সেই ক্ষতি ফেরত পাবেন বা সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে? হবে না। তাহলে আমরা সেই প্রতিশোধের মাইন্ডসেট (মানসিকতা) থেকে বেরিয়ে এসে ভাবি যে, আমরা দেশের জন্য, সমাজের জন্য বা মানুষের জন্য কী করতে পারি? সফল হওয়া বা না হওয়া পরের ব্যাপার, অন্তত এ মানসিকতা নিয়ে কেন আমরা সামনের দিনে এগিয়ে যাব না?প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সমাজ ও দেশের জন্য ইতিবাচকভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত ক্ষতি বা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিলেই তা ফিরে পাওয়া যায় না; বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণে মনোযোগ দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তারেক রহমান এ আহ্বান জানান। এর আগে দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।
তিনি বলেন, ১৬ জুন সংবাদপত্র জগতের জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। আজকের এই দিনে একসময় বাংলাদেশের সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আর আজ সেই দিনে আমরা এত সংখ্যক সাংবাদিক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছি। তার মানে একটি বিষয় প্রমাণিত হয়েছে- সংবাদপত্রের কণ্ঠ যেভাবে চেপে ধরা হয়েছিল, সেটি অন্তত এই মুহূর্তে আর নেই। এটি প্রথম বিষয়।সরকারপ্রধান বলেন, দ্বিতীয় বিষয় হলো-সংবাদপত্রের যে মালটি-পার্টি ডেমোক্রেসি (বহুদলীয় গণতন্ত্র), সেটিকে কেড়ে নিয়ে মাত্র চারটি সংবাদপত্র বাদে সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত করে ‘বাকশাল’ নামে একটি দল গঠন করা হয়েছিল। পরে দেখেছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন, তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলেন এবং একই সঙ্গে সংবাদপত্রের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেন। পরবর্তী সময়ে কী হয়েছে বা কতটুকু হয়েছে, তা আপনাদের কথা থেকেই বেরিয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার পরিবেশ নেই।
সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে এখন একটি বড় সমস্যা হচ্ছে মাদক। বিশ্বব্যাপী কম-বেশি এ সমস্যা থাকলেও আমাদের এখানে এর প্রকোপ আশঙ্কাজনক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কতজনকে ধরব, কতজনকে চিকিৎসা দেব বা কাউন্সেলিং করব? আমাদের তো সক্ষমতা ও সম্পদের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। তাই এ সমস্যার সমাধানে আমাদের বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।’
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীদের শারীরিক ও মানসিক যে বিপুল শক্তি থাকে, তা ইতিবাচক খাতে ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে হবে। আর এর অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো খেলাধুলা ও সংস্কৃতি। অথচ ঢাকা শহরসহ সারা দেশেই এখন খেলার মাঠের তীব্র সংকট।তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করেছি। সম্প্রতি শেষ হওয়া একটি শিক্ষা বিভাগীয় ইভেন্টে সারা দেশের প্রায় ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে অংশ নিয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে সব পরিবারের সন্তানরা এখানে যুক্ত হয়েছে। অথচ দুঃখের বিষয়, এতবড় একটি আয়োজন আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে সেভাবে গুরুত্ব পায়নি।শুধু খেলাধুলা নয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতেও তরুণদের মেধা বিকাশের জন্য জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী মেলা বা সায়েন্স ফেয়ার আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এসব অনুষ্ঠানের কাভারেজ বেশি বেশি দেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন।
পুরো বিশ্ব এখন বুঁদ ফুটবল উন্মাদনায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরাও এ আবহের বাইরে নন। পুরো বাংলাদেশ যেখানে মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা-এ দুই শিবিরে বিভক্ত, সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্য ইঙ্গিত দিলেন। গতকাল একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ফুটবল নিয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে; এ বিশ্বকাপের জোয়ারে বাংলাদেশও ভাসছে। আপনি (প্রধানমন্ত্রী) কোন দেশকে সমর্থন করেন?সরাসরি জবাব না দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন একটি দেশে (ইংল্যান্ড) ছিলাম, বুঝতেই পারছেন।’ পরে ওই সাংবাদিককে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি আপনার উত্তর পেয়েছেন তো?দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পরে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয় পায়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তিনি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিন, যেমন ১৬ ডিসেম্বর বা ২১ শে ফেব্রুয়ারি ছাড়া কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সারা বছর সাংস্কৃতিক বা বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয় না। যুবসমাজকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে এ চর্চাগুলো সারা বছর চালু রাখতে হবে।তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার ওপর তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, আজকাল দেখা যায় একটি জীবন্ত প্রাণীকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে এবং ১০ জন মিলে তা মোবাইল ফোনে রেকর্ড করছে। এগুলো অস্বাভাবিক মানসিকতা। স্কুলপর্যায় থেকেই আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং সরকারের প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার্স কার্ড’-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে এক সাংবাদিক নতুন সরকার গঠনের পর চার মাসের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের পর সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে যে আনন্দ ও প্রত্যাশা তিনি দেখেছেন, সেটি তাকে যেমন অনুপ্রাণিত করছে, তেমনি দায়িত্বের চাপও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অনেকে এটার বিভিন্ন অর্থ করতে পারেন। কিন্তু অবশ্যই দায়িত্বের একটা চাপ অসম্ভবভাবে অনুভব করছি। প্রচুর সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’ তারেক রহমান বলেন, তার বাবা একসময় বলেছিলেন, দিনে যদি ২৪ ঘণ্টার বদলে ৪৮ ঘণ্টা হতো, তাহলে আরও বেশি কাজ করা যেত।
নিজের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, তিনি জেলজীবনে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। এখনো এক্স-রে করলে দেখা যাবে, আমার পিঠের হাড্ডিটা কিছুটা বাঁকা অবস্থায় রয়েছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হওয়ায় সেটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, স্পিচ রাইটার এসএএম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন, শাহাদাত হোসেন স্বাধীন, যুগান্তরের নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন, সিনিয়র সাংবাদিক কাদের গনি চৌধুরী, কাদির কল্লোল, সুমন মাহমুদসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।