শুধুই কি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব! এত খুন - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুধুই কি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব! এত খুন


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:দেশজুড়ে গুলি করে হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।দেশের বিভিন্ন স্থানে যখন-তখন ঘটছে গুলির ঘটনা, বাতাসে ছড়াচ্ছে বারুদের গন্ধ। এসব ঘটনার মধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে একই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠছে। একের পর এক প্রকাশ্য গুলির ঘটনায় জনমনে তৈরি হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা।

ঢাকার রামপুরায় একসময়ের আলোচিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্লা পলাশ’ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সহিংস ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামে যুবদল নেতার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সড়ক অবরোধ, খুলনায় বিএনপি নেতার হত্যা এবং মসজিদের ভেতরে গুলির মতো অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।অন্যদিকে মালিবাগ-মৌচাক এলাকার আনারকলি মার্কেটের পার্কিংস্থলে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল হোসেন হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে।দিনের আলোয় একের পর এক এমন সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলছে।অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, একই দল, একই মতাদর্শ ও একই নেতৃত্বের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও সংঘাতের পেছনে আদর্শিক বিরোধের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ সুবিধা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতাই বেশি ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে স্বার্থের দ্বন্দ্ব।

তিনি বলেন, অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা নয়, অপরাধে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ করে নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তবে দলীয় কোন্দলও মাঝে মাঝে ভয়াবহ আকার ধারণ করে, সেদিকেও সাংগঠনিকভাবে নজর দিতে হবে।

গুলি-খুনে বাড়ছে উদ্বেগ, উঠছে দলীয় কোন্দলের অভিযোগ
দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক গুলি, হত্যা ও সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। চট্টগ্রাম, খুলনা থেকে রাজধানী ঢাকা—প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা ও হামলার ঘটনায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে কয়েকটিতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামও সামনে এসেছে। কোথাও দলীয় কোন্দলের অভিযোগ উঠেছে, কোথাও আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাব-প্রতিপত্তির দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত মিলেছে। যদিও পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ঘটনার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।

রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ চৌধুরী নিহত
শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক প্রকাশ মাসুদ চৌধুরী দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। রাউজান উপজেলার পাহাড়তলি এলাকায় বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে অবস্থানকালে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা ৫ থেকে ৭ জন অস্ত্রধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

নিহত মাসুদের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী এলাকায়। তিনি বেতাগী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি স্বপন চৌধুরীর ছোট ভাই। হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বালু ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে এখনও মামলা হয়নি। দলীয় কোন্দলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আবেগের কারণে অনেকে অনেক কথাই বলতে পারে। তদন্তের পরই প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’

রাউজানে আগেও যুবদল কর্মী নিহত
চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল রাতে রাউজানে নাছির উদ্দীন (৪৫) নামে এক যুবদল কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, বালু ও মাটির ব্যবসা এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে।পুলিশ জানায়, নিহত নাছির উদ্দীনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ ছয়টি মামলা ছিল। এর আগে রাউজান পৌরসভার আইলিখীল এলাকায় মুহাম্মদ কাউসার উজ জামান বাবলু নামে আরও এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় রাউজানজুড়ে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

খুলনায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম হত্যা
গত ১২ জুন দুপুরে খুলনা নগরের লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে রফিকুল ইসলাম (৩৫) ওরফে ‘ঢাকাইয়া রফিক’ নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, বাজারে বসে থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা এক দুর্বৃত্ত তার তলপেটে গুলি করে পালিয়ে যায়। তিনি পাথর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

মসজিদের ভেতরে গুলি, আহত দুই মুসল্লি
রোববার (১৪ জুন) ভোরে খুলনার দৌলতপুর থানার পশ্চিম কাশীপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদে ফজরের নামাজ চলাকালে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা ঢুকে গুলি চালায়। এতে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি লোকমান হাকিম (৪৫) ও আলম শেখ (৫৫) গুলিবিদ্ধ হন।পুলিশ জানিয়েছে, হামলার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পূর্বশত্রুতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রাজধানীতে গুলিবিদ্ধ ‘কাইল্লা পলাশ’
গত ১২ জুন দুপুরে রাজধানীর পশ্চিম রামপুরার মক্কি মসজিদসংলগ্ন এলাকায় এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্লা পলাশ’ গুলিবিদ্ধ হন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় আগে থেকে ওত পেতে থাকা দুই যুবক তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়।ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান বলেন, দীর্ঘদিন কারাভোগের পর সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘কাইল্লা পলাশ’কে লক্ষ্য করেই হামলাটি চালানো হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ করছে পুলিশ।

তদন্তেই মিলবে উত্তর
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় বিভিন্ন স্থানে দলীয় কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ব্যক্তিগত বিরোধের অভিযোগ উঠলেও পুলিশ বলছে, তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ঘটনার কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। একটি হত্যাকাণ্ডের পর নানা ধরনের অভিযোগ ও দাবি উঠতে পারে। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে অনেক সময় দেখা যায়, ঘটনাটি রাজনৈতিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো দ্বন্দ্বের ফল নয়; বরং ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরেই সংঘটিত হয়েছে।তিনি বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর দেশের আলোচিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে।

বিল্লাল হত্যাকাণ্ড: আধিপত্যের দ্বন্দ্ব ও পদ-পদবির লড়াই
গত ৮ জুন মালিবাগ-মৌচাক এলাকার আনারকলি মার্কেটের পার্কিংস্থানে সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার হত্যাকাণ্ডকে তাৎক্ষণিক তর্কবিতর্ক বা ক্ষণিকের উত্তেজনার ফল বলে মনে করছে না পুলিশ।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ধারণা, মার্কেটকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার, প্রভাব-প্রতিপত্তি, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ-অসন্তোষ এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।এ ঘটনায় যাদের নাম আলোচনায় এসেছে, তাদের অধিকাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, আধিপত্যের পাশাপাশি সাংগঠনিক পদ-পদবি ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতাও বিরোধকে তীব্র করেছে। ফলে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

গ্রুপিং-লবিংয়ে বাড়ছে অসন্তোষ
ঢাকায় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিএমপির বিভিন্ন থানার কমিটি গঠনসহ নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, সাংগঠনিক মূল্যায়নের চেয়ে গ্রুপিং ও লবিং পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলছে।নেতাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন জেল-জুলুম সহ্য করে দলীয় আদর্শে নিবেদিতভাবে কাজ করলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের চেয়ে জুনিয়র বা নিজস্ব কর্মীরাই গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান পাচ্ছেন। এতে সংগঠনের ভেতরে হতাশা, রেষারেষি ও অসন্তোষ বাড়ছে।

মে মাসে ৬৪ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৫
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বলছে, চলতি বছরের মে মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জনের বেশি আহত হয়েছেন।প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। এপ্রিল মাসে ৯৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ৫৩৩ জন আহত হয়েছিলেন।প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা, দলীয় ও অন্তর্কোন্দল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে স্বার্থের সংঘাত, আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লড়াই অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসতার রূপ নিচ্ছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে।

Top