কর আসবে যেসব খাত থেকে - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কর আসবে যেসব খাত থেকে


জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:মদ-সিগারেট, রড ও সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মোটা অঙ্কের রাজস্ব আদায় করতে চায়। বাকিটা করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার মতো বিশাল রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব কিনা, তা নিয়ে আলোচনা চলছে সব মহলে।রাজস্ব খাতে ব্যাপক ছাড় দেওয়ায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে রয়েছেন, তবে দুশ্চিন্তাও আছে।

রাজস্ব আদায়ের দুর্দশার কথা স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় (১১৬ পৃষ্ঠা) বলেছেন, ‘এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জগুলো হলো-নিু কর-জিডিপি অনুপাত, কর অব্যাহতির বিস্তৃত সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র করভিত্তি, কর ফাঁকি ও ডিজিটালাইজেশনের ঘাটতি। এই চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে হ্রাস করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয়করণের (এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন) মাধ্যমে কর প্রদান পদ্ধতি সহজ করাসহ ব্যবসাবান্ধব নীতি সংস্কারের রূপরেখা গ্রহণ করেছি। এই বাজেট সেই দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করবে, যা অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলবে।’ অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, রাজস্ব ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এরই অংশ হিসাবে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং করসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে করনীতি প্রণয়ন করা হবে।

বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকার বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ (ডিরেগুলেশন) নীতিতে প্রাধান্য দিয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টিতে গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণে ৫ বছর মেয়াদি করপোরেট কর কাঠামো; শিল্পের কাঁচামালে অগ্রিম আয়করে ছাড়; মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা; কম্পিউটার, সেমিকন্ডাক্টর, বায়োহাইজিন মেশিন উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদির রেয়াতি সুবিধা দিয়েছেন। এছাড়া বিদ্যমান শিল্পে ভ্যাট ছাড়ের সুবিধার মেয়াদ বাড়িয়েছে। সৃজনশীল, সুনীল ও ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশে কর ছাড় দিয়েছেন। যা ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। তাছাড়া সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে নিত্যপণ্য, ওষুধসহ অনেক পণ্যের শুল্ক-কর, ভ্যাট ছাড় দিয়েছে।

এমন বাস্তবতায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার মতো বিশাল রাজস্ব লক্ষ্য কীভাবে অর্জিত হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ-হিসাববিদসহ সব মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সবার প্রশ্ন একটাই-কোত্থেকে আসবে এত টাকা? এ বিষয়ে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ব্যাখ্যা দেননি। শুধু মোবাইল সিম কার্ডের ওপর সুনির্দিষ্ট কর ৩০০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ ধার্য করায় কত টাকা সরকার রাজস্ব হারাবে তা উল্লেখ করেছেন (পৃষ্ঠা-১৫৪)। এ খাতে সরকার এক হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব কমবে বলে অর্থমন্ত্রী জানান। এছাড়া শুল্ক-কর, ভ্যাট ও আয়কর হার হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে কোন খাতে কত টাকা রাজস্ব আদায় বাড়বে-কমবে তার পরিসংখ্যান দেননি অর্থমন্ত্রী।

এনবিআরের বাজেট প্রণয়ন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা, ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান করহার হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে কোন খাতে কত টাকা আয় বাড়বে বা কমবে, তার ফিরিস্তি তুলে ধরতেন। এরপর আর কোনো অর্থমন্ত্রী এই চর্চা করেননি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে পড়ে এনবিআর গত দুই বছর এ ধরনের পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। তবে সেটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত ছিল না।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে-সেটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুধু উচ্চাভিলাষী নয়, অবাস্তবও। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী আগামী অর্থবছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, আর চলতি অর্থবছরে ৪ শতাংশ। এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে এতবড় রাজস্বের লক্ষ্য আদায় সম্ভব নয়। উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার কারণে আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। কেন না সরকার রাজস্ব আদায় করতে না পারলে ব্যাংক ঋণের দ্বারস্থ হবে। তখন বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সংকুচিত হবে, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি আরও বলেন, শুল্ক-কর, ভ্যাট ও আয়কর হার হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে কোন খাতে কত টাকা রাজস্ব আদায় বাড়বে বা কমবে, সে বিষয়ে অর্থমন্ত্রী অথবা এনবিআরের একটি ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এতে রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতার পাশাপাশি অংশীজনদের মধ্যে আস্থা বাড়তে পারত।

কোন খাতে কত আদায়-ছাড় : এনবিআরের বাজেট প্রণয়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর কোন খাতে কত ছাড় দিলে কী পরিমাণ রাজস্ব আদায় বাড়তে বা কমতে পারে, তার প্রাথমিক ধারণা সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়। তার ভিত্তিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। যেমন-এ বছর সিম কার্ডের সুনির্দিষ্ট কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কমবে। এছাড়া ফ্রিজ-রেফ্রিজারেট উৎপাদনে ভ্যাট সাড়ে ৭ শতাংশ করায় একশ কোটি টাকা, স্বর্ণের ভ্যাট কমানোয় ৭০-৮০ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আদায় কমবে। তবে সিগারেটের মূল্যস্তর বাড়ানোয় ১০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্যাকেজ ভ্যাট (টার্নওভার ট্যাক্স) বাবদ এক হাজার কোটি টাকা, ভ্যাটের ভিত্তি বাড়ানোর মাধ্যমে ২ হাজার কোটি টাকা, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা, আপিল মামলার জমা কমানোসহ ব্যবসা সহজীকরণ করায় ১০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায় বাড়ানো সম্ভব। সব মিলিয়ে নীতি-বিধি পরিবর্তনের কারণে ৫০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায় বাড়বে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় শতাধিক পণ্যের রেগুলেটরি ডিউটি ৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ উন্নীত করায় ৩ হাজার কোটি টাকা শুল্ক আদায় বাড়বে বলে মনে করছেন বাজেটসংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া তেলের গাড়ি, শিট, অপ্রক্রিয়াজাত তামাক, কপার তার ও টিউব, মোটর, পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার, সিরামিক টাইলস, ওয়াশ বেসিন, টলুইন, কম্প্রেসার অয়েলের শুল্ক বাড়ানোয় কাস্টমস ডিউটি এক হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। তবে আমদানি শুল্কের পুরোটাই নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের ওপর।

Top