জট খুলছে, এবার উচ্চ আদালতেও নারী-শিশু মামলায় দ্রুত বিচার - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জট খুলছে, এবার উচ্চ আদালতেও নারী-শিশু মামলায় দ্রুত বিচার


মোহাম্মাদ মহাব্বাতুল্লাহ মাহাদ:নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় দ্রুত বিচারের সফলতা আটকে যায় উচ্চ আদালতে।তবে উচ্চ আদালতে গিয়ে এসব মামলা দীর্ঘসময় ধরে ঝুলে থাকে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনজীবীদের আবেদনে আলাদা বেঞ্চ গঠন করেছেন প্রধান বিচারপতি। এই বেঞ্চে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক মামলাগুলোর শুনানি হবে। এই বেঞ্চ গঠনের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রামিসা হত্যা মামলার শুনানিতে বিশেষ টিম গঠন করেছেন। যার নেতৃত্বে রয়েছেন স্বয়ং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তার মতে, বিরতিহীনভাবে তারা এ মামলার শুনানি করবেন। যাতে মামলাগুলোর ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। বিচারিক আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হাইকোর্টে ঝুলে থাকে বছরের পর বছর।কারণ ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয় সাল অনুযায়ী। বর্তমানে ২০১৮-১৯ সালের ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে।সে হিসাবে রামিসার মামলা উচ্চ আদালতে শুনানি শুরু হতে আরও সাত থেকে আট বছর লেগে যাওয়ার কথা।এ সমস্যার কথা উঠে এসেছে আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যেও।তারা বলেছেন, রামিসা, আছিয়ার মামলাসহ আরও কয়েকটি মামলায় দ্রুত বিচার হয়েছে।

উচ্চ আদালতে মামলা ঝুলে থাকার বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রামিসা হত্যার ঘটনার সাত ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২৪ মে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। মাত্র ছয় কার্যদিবসে বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। আছিয়ার মামলাসহ আরও কয়েকটি মামলায় দ্রুত বিচার হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে গিয়ে এসব মামলা দীর্ঘসময় ধরে ঝুলে থাকে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

রামিসা হত্যার পর আইনজীবী ফয়জুল্লাহ ফয়েজসহ কয়েকজন আইনজীবী ২১ মে প্রধান বিচারপতির কাছে একটি আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আমরা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করছি, দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা এ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে, বিভিন্ন সমযে অধস্তন আদালতে চাঞ্চল্যকর, নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার হলেও হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল এবং আপিল বিভাগের আপিল শুনানি করতে দীর্ঘসময় লেগে যাচ্ছে।

মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামির ফাঁসি হলেও ডেথ রেফারেন্স কবে শুনানি হবে অনিশ্চিত, ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলাসহ বহু মামলা এভাবে অপেক্ষমাণ অবস্থায় আছে। ফলে সর্বশেষ মিরপরে নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু রামিসার বাবা বলেই বসলেন, আপনারা বিচার করতে পারবেন না।’

আবেদনে আরও বলা হয়, বিচারক ও আইনজীবী হিসেবে আপনাদের ও আমাদের সকলের এই দায় এড়ানোর উপায় নেই, তবে জুডিসিয়ারির সীমাবদ্ধতা আমরা বুঝি। তবুও সীমাবদ্ধ পরিস্থিতিতেও শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো আলাদা করে, এতৎসংক্রান্ত মামলাগুলো (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল), বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে শুনানির ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।

এরপর শিশু রামিসা হত্যার রায়ের দিন আলাদা বেঞ্চ গঠনে অ্যাটর্নি জেনারেল উন্মুক্ত আদালতে প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ জানান। এসময় সিনিয়র আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী ও সালাহ উদ্দিন দোলন অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য সমর্থন করেন। তখন প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের কথা বলেন।

এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (১০ জুন) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজাকে নিয়ে গঠিত এ হাইকোর্ট বেঞ্চ রোববার থেকে বিচারকাজ পরিচালনা করবেন।বেঞ্চ গঠন নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছেন। বিশেষ বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর আদালতে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে বলেছি, আমরা রামিসা হত্যা মামলার শুনানিতে কোনো মুলতবির আবেদন করব না, বিরতিহীনভাবে শুনানি করব।

পেপারবুক প্রস্তুতের পর এই বেঞ্চে রামিসা হত্যা মামলার শুনানি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এছাড়া শিশু রামিসা হত্যা-ধর্ষণ মামলা হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। টিমে রয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার ওসমান চৌধুরী, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মেহেদী হাসান, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিউল হক ফয়সাল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল দেওয়ান হুমায়ুন কবির রিপন।

প্রধান বিচারপতির গঠন করা বিশেষায়িত বেঞ্চ রোববার থেকে মামলার শুনানি শুরু করবেন। এই বেঞ্চে রোববারের তালিকায় নারী শিশু বিষয়ক ২০টি মামলা কার্যতালিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাগুরার আলোচিত আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা এবং ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলা।

শিশু আছিয়ার নির্মম ঘটনাটি ঘটে মাগুরা সদর উপজেলায়। রমজানের ছুটিতে শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে গত বছরের ৫ মার্চ রাতে শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়। বোনের শ্বশুর হিটু শেখ মেয়েটিকে শুধু ধর্ষণই করেননি, হত্যারও চেষ্টা চালান।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যু হয় আট বছর বয়সী শিশুটির। এ ঘটনায় ভিকটিমের মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল আলোচিত এ মামলায় অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২৭ এপ্রিল। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২৯ জন সাক্ষ্য দেন।গত বছরের ৭ মে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে শেষ হয় আলোচিত এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম। এক বছর আগে ১৩ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসানের আদালতে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। একই বছরের ১৭ মে রায় ঘোষণা করা হয়।শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখকে (৪৭) মৃত্যুদণ্ড দেন মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

রায়ে বাকি তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন– নিহত শিশুর বোনের স্বামী সজীব শেখ (১৯), সজীব শেখের ছোট ভাই (১৭) ও সজীবের মা জাহেদা বেগম (৪০)।

ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলে তা অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় কার্যক্রম উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সে অনুসারে এ মামলার নথিও গত বছরের ২১ মে উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়। পরে সব যাচাই-বাছাই শেষে পেপারবুক তৈরির জন্য বিজি প্রেসে পাঠানো হয়।

প্রস্তুতের পর পেপারবুক ৮ জুন হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর শুনানির জন্য বিশেষায়িত বেঞ্চের কার্যতালিকাভুক্ত হয়।

এদিকে, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী নুসরাত জাহানকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন তার মা শিরীন আখতার। এ মামলার জের ধরে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এরপর তার অনুগত কিছু ক্যাডার জনমত গঠন করে সিরাজকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য। ৩ এপ্রিল খুনিরা সিরাজের সঙ্গে কারাগারে পরামর্শ করে এসে ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে খুন করার পরিকল্পনা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টা চালায় তারা।

ঘটনাস্থল থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় সেখান থেকে নুসরাতকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।

এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা করেন। এ মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর নির্ধারণ করেন। মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা হয়।

একই বছরের ২৪ অক্টোবর রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। আসামিরা হলেন– সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা (৫৭), নূর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)।

২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার সব ধরনের কার্যক্রম হাইকোর্টে পৌঁছায়। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক (মামলার সব নথি) ছাপানো শেষ করা হয়েছিল। পরে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতি বরাবর উপস্থাপন করা হয়। এরপর প্রধান বিচারপতি শুনানির জন্য হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্ধারণ করেন। এছাড়া আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেছেন।

Top