ভরা মৌসুমেও ঊর্ধ্বমুখী চালের বাজার - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভরা মৌসুমেও ঊর্ধ্বমুখী চালের বাজার


মোহাম্মাদ নাসির উদ্দিন:ভরা মৌসুমেও ঊর্ধ্বমুখী এখানকার চালের বাজার। ঈদের পর মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজির বস্তায় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।ইরি-বোরো মৌসুমে সাধারণত চালের বাজারে স্বস্তি ফেরার কথা। তবে এবার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের অন্যতম ধান উৎপাদনকারী জেলা দিনাজপুরে। ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা বলছেন, চালের এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নেই। ধানের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়া, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঘনঘন লোডশেডিং—এই চারটি কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে গেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে চালের বাজারে।

দিনাজপুরের বাহাদুরবাজারের চাল ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের আগে যে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তা ৩ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ টাকায়। আঠাশ জাতের চালের বস্তা ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৮৫০ টাকা। উনত্রিশ জাতের চালের বস্তা ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকা, সুমন স্বর্ণা চাল ২ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং চিনিগুড়া চালের বস্তা ৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ইরি-বোরো মৌসুমের শেষদিকে বাজারে ধানের সরবরাহ কমে এসেছে। বর্তমানে যে ধান বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশই মজুতকারীদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ধানের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।বাহাদুরবাজারের ব্যবসায়ী আলাল উদ্দিন ব্যাপারী বলেন,এ সময়ে সাধারণত চালের দাম কমে। কিন্তু এবার উল্টো প্রতি বস্তায় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ধানের দাম ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।

চাল ব্যবসায়ী আশরাফ আলী ছুটু বলেন, ব্যবসায়ীরা খুব বেশি লাভ করছেন এমন নয়। মিলগেট থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বাজারে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এখন আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।তবে দাম বাড়লেও বিক্রি কমে গেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। বাহাদুরবাজারের ব্যবসায়ী ফিরোজ বলেন, আগে যেখানে প্রতিদিন ৫০ বস্তা চাল বিক্রি করতাম, এখন পাঁচ বস্তাও বিক্রি হয় না। মানুষ প্রয়োজন ছাড়া চাল কিনছে না।

মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনাজপুরে প্রায় দুই হাজার চালকল রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি অটোরাইস মিল। ধানের মৌসুমে এসব মিল থেকে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হতো। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ উৎপাদন কমেছে প্রায় অর্ধেক।

মিল মালিকদের দাবি, উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশই এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিনির্ভর। একটি অটোরাইস মিলে চাল উৎপাদনের মোট ব্যয়ের প্রায় ১৫ শতাংশই বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হয়। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মেশিনপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার অতিরিক্ত খরচও যুক্ত হচ্ছে উৎপাদনে।

বাংলাদেশ অটো,মেজর ও হাস্কিং মিল মালিক সমিতির সহ-সভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এখন আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে খরচ আরও বাড়বে।ব্যবসায়ীরা খুব বেশি লাভ করছেন এমন নয়। মিলগেট থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।দিনাজপুর চাল ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি আজগার আলী বলেন, ধান, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব চালের বাজারে পড়েছে। মিলগেটে দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।

অন্যদিকে বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। বাহাদুরবাজারের ক্রেতা আমীর হোসেন বলেন,মানুষের আয় বাড়েনি, কিন্তু চালসহ সব পণ্যের দাম বাড়ছে। ভাতই যদি নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের চলবে কীভাবে?

সংশ্লিষ্টদের মতে, ধানের সরবরাহ আরও কমে গেলে এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী সপ্তাহগুলোতে চালের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ফলে ভরা মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই চালের দাম যে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, তা ভোক্তাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

Top