অর্থ পাচারে জড়িতরা ঋণ পাবে না,বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল
মোহাম্মাদ মহাব্বাতুল্লাহ মাহাদ:বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে সরকার। ঋণ বিতরণের প্রথম ছয় মাস সুদ পরিশোধে ছাড় থাকবে। এরপর থেকে সুদ আদায় ও পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হবে। একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের অনুকূলে এ স্কিমের আওতায় ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি হবে না। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। তবে তহবিলের প্রাপ্যতা ও সন্তোষজনক লেনদেনের ভিত্তিতে ঋণ নবায়নের সুযোগ থাকবে।যারা অংশ নিতে পারবেসব তালিকাভুক্ত ব্যাংক এ স্কিমে অংশ নিতে পারবে, তবে তার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে চুক্তি সই করতে হবে। স্কিমের আওতায় বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের এমন প্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা পাবে, যেগুলো আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কিংবা কার্যকর মূলধনের সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন ও সেবা দিতে পারছে না।বিশেষ করে রফতানিমুখী ও উচ্চ রফতানি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ প্রদানে অগ্রাধিকার দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হবে। এছাড়া কোনো উদ্যোক্তা অধিগ্রহণ বা ভাড়া চুক্তির মাধ্যমে বন্ধ প্রতিষ্ঠান চালু করলে তাকেও অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ঋণ দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা, মূলধনের প্রয়োজনীয়তা এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা বা বিপণন সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কেবল কার্যকর মূলধনের ঘাটতি পূরণের জন্য এই ঋণ ব্যবহার করা যাবে না।উৎপাদন ও কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা প্রমাণে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে। তবে প্রয়োজন হলে ব্যাংক নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতেও ঋণ অনুমোদন করতে পারবে। স্কিমের অর্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, কাঁচামাল সংগ্রহ, রফতানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে। তবে এ অর্থ দিয়ে কোনো বিদ্যমান ঋণ সমন্বয় বা পরিশোধ করা যাবে না।শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়ার ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন করা যাবে নাÑ ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস-এমএফএস হিসাবের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এজন্য প্রত্যেক শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বেতন-ভাতা বাবদ সর্বোচ্চ চার মাসের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা যাবে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত গ্রাহক, অথবা অর্থ পাচার, জালিয়াতি, ঋণ তছরুপ বা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ স্কিমের সুবিধা পাবে না।ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে তারল্য সহায়তার মাধ্যমে বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফের চালু করাই এ স্কিমের লক্ষ্য। এই তহবিল সরকারের আগে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবন’ প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ। সুনির্দিষ্ট ঋণ সহায়তার মাধ্যমে বন্ধ কারখানা চালু করা, স্থবির হয়ে পড়া রফতানি সচল করা ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার উদ্দেশে এটি গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গতকালের একটি সার্কুলারে বলা হয়েছে, এই প্রাক-অর্থায়ন স্কিমের মেয়াদ তিন বছর। এ তহবিল থেকে ঋণখেলাপি, অর্থ পাচার, জাল-জালিয়াতি ও আগের ঋণের অর্থ অপব্যবহার করেছে এমন প্রতিষ্ঠান ঋণ নিতে পারবে না। এই স্কিমের আওতায় ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ৪ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করবে। আর গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
আদায় ও তদারকি
সার্কুলারে ঋণ আদায় ও তদারকির বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রাক-অর্থায়নের বিপরীতে গৃহীত অর্থের সুদ বা মুনাফা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিশোধ করতে হবে। ঋণ আদায়, সমন্বয় বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সর্বশেষ ত্রৈমাসিকের সুদসহ পুরো অর্থ ফেরত দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত চলতি হিসাব থেকে অর্থ সমন্বয় করা হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সময়ের জন্য অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদ আরোপ করা হবে।
ঋণ-সংক্রান্ত সব ধরনের ঝুঁকি সংশ্লিষ্ট ব্যাংককেই বহন করতে হবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্বও ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকের ওপর থাকবে। কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের ঋণ আদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা সম্পর্কিত করা যাবে না। গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী তা খেলাপি ও প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে।ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি ত্রৈমাসিকে কারখানা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও যেকোনো সময় সরেজমিনে ঋণ কার্যক্রম যাচাই করতে পারবে।স্কিমের মেয়াদকালে বা পরে কোনো পরিদর্শন বা নিরীক্ষায় ঋণের অপব্যবহার ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে গ্রাহককে প্রদত্ত সুদের হারসহ অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদে এককালীন অর্থ কর্তন করা হবে।ঋণগ্রহীতা নির্বাচন, ঋণ মঞ্জুরি, বিতরণ, দলিল সম্পাদন, ঋণের ব্যবহার ও তদারকির বিষয় ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হবে। ঝুঁকি কমাতে ব্যাংক প্রয়োজনে কার্যকর মূলধনের বিপরীতে জামানত নিতে পারবে। একক ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে ঋণসীমা-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বিধান কার্যকর থাকবে।
যোগ্য প্রতিষ্ঠানের আগের অবলোপনকৃত ঋণ থাকলেও নির্দিষ্ট শর্তে পুনঃতফসিল বা নীতি সহায়তার আওতায় নতুন সুবিধা দেয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা খেলাপি হিসেবে গণ্য হবে না এবং হিসাব এসএমএ হিসেবে থাকবে। তবে টানা ছয়টি মাসিক বা দুটি ত্রৈমাসিক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণ পুনরায় মন্দ ও ক্ষতিজনক হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হবে।
ঋণের অপব্যবহার, মিথ্যা তথ্য প্রদান, জালিয়াতি, অনিয়ম বা খেলাপির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতার তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে পাঠানো যাবে এবং আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হবে। কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।