জনবান্ধব ও সংস্কারমূলক বাজেট চায় জামায়াত
মোহাম্মাদ মহাব্বাতুল্লাহ মাহাদ:স্বাধীনতার পর থেকে বিগত বছরগুলোতে দেশের বাজেট জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো অনুষঙ্গ হতে পারেনি।এবার গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কারমূলক, জনবান্ধব, বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় বাজেটের মূল উদ্দেশ্য হলো সম্পদ পুনঃবণ্টনের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। কিন্তু সেই বাজেট যেন সাধারণ মানুষকে শোষণের হাতিয়ার বা অর্থ পাচারের বন্দোবস্ত না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।রোববার রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে অর্থনৈতিক বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা এসব কথা বলেন। ‘জাতীয় বাজেট ভাবনা’-মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন প্রফেসর ড. একেএম ওয়াসরেসুল করিম। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সংসদে এবার বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা দেবে জামায়াত। এর অংশ হিসাবে বাজেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। ৮ থেকে ৯টি ভাগে বিভিন্ন অংশীজন গ্রুপের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা তৈরি করা হবে।মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আমরা সরকারের বাজেট ও দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে আরেকটু মজবুত এবং শক্তিশালী করার কাজে সাহায্য করতে চাই। জামায়াত ইতোমধ্যে ৭-৮টি প্রাক-বাজেট আলোচনার আয়োজন করেছে। এসব আলোচনা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো সংক্ষিপ্ত করে দলের পার্লামেন্টারি বডির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, বিরোধী দল হিসাবে সংসদে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা কঠিন। তা সত্ত্বেও জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আমরা কেমন বাজেট চিন্তা করি, যা জনগণের জানা উচিত। সে লক্ষ্যেই আমরা বাজেটে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে চাই।তিনি বলেন, সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি। ক্ষমতার আসার পর বিএনপি এখন আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে না। স্বাধীনতার পর থেকে বাজেট বেড়েছে হাজার গুণ। কিন্তু জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। অথচ দুর্নীতির পরিধি বেড়েছে। তিনি বলেন, বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো বাজেটে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা না থাকায় এই দুর্নীতি আমাদের গ্রাস করে ফেলেছে। শিক্ষা খাতে আমাদের দেশে সবচেয়ে কম বাজেট বরাদ্দ। কমপক্ষে জিডিপির ৬% থাকার কথা, আছে ২% এর নিচে।সভাপতির বক্তব্যে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম নির্বাচিত সরকার এই বাজেট দিতে যাচ্ছে। ফলে দেশের মানুষ এই বাজেটে জুলাই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে চায়। দেশের মানুষের ওপর বাড়তি করের বোঝা না চাপিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাজেট তৈরির ওপর তাগিদ দেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে ড. একেএম ওয়াসরেসুল করিম বলেন, আগামী বাজেটে যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই আসবে প্রত্যক্ষ করের (ভ্যাট) মাধ্যমে। এই টাকা গরিব ও মধ্যবিত্তের পকেট থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি যাবে। তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা রাজস্ব আদায়ে কোনো সৃষ্টিশীল বা বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে চান না। তারা প্রথাগত উৎসের বাইরে গিয়ে কষ্ট করতে চান না বলেই সহজ মাধ্যম হিসাবে ভ্যাটকেই আয়ের প্রধান উৎস বানাচ্ছেন।এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, করের হার বাড়ানো কোনো বাহাদুরি নয়। এটি সবাই পারে। কিন্তু করের আওতা বাড়াতে দক্ষতা লাগে। যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে যারা কর ফাঁকি দিচ্ছে তাদের কাছ থেকে আদায় নিশ্চিত করুন।
জামায়াত ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, আমলারা যেভাবে বাজেট প্রণয়ন করেন তাতে কেবল তাদের চিন্তাভাবনার প্রতিফলনই ঘটে। সেখানে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ থাকে না। আমাদের ট্র্যাডিশনাল বাজেট ভাবনা থেকে বের হওয়ার পথ দেখাতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে বাজেটের আকার বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি ও অপচয় বাড়বে। এতে প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।অনুষ্ঠানে অন্যান্যের আলোচনায় অংশ নেন-সাবেক সিনিয়র সচিব খ ম কবিরুল ইসলাম, জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নেসা সিদ্দিকা এমপি, সাবিকুন্নাহার মুন্নী এমপি, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান, দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, এসএটিভির বার্তা সম্পাদক সালাহ উদ্দিন বাবলু, আউটলুক বাংলার প্রধান সম্পাদক লুৎফুল কবির সাদী, বাংলাদেশ পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সদরুল হাসান, ইআরএফের সাবেক সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মীরধা।