গুম-খুনের তিন মামলার রায় হতে পারে এ বছর
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া :তিন হাজারের বেশি নেতাকর্মী ও ব্যক্তিকে গুম ও খুনের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, র্যাব ও পুলিশের সাবেক সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম চলছে। সাক্ষ্যগ্রহণে আসামিদের বিরুদ্ধে সে সময়ে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার দুঃসহ বর্ণনা উঠে এসেছে।বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের একাধিক মামলা ও অভিযোগের বিচার কার্যক্রম চলছে। দল হিসাবে বিএনপি ও জামায়াত এবং ভুক্তভোগীদের পরিবার এসব অপরাধের অভিযোগ করেছে। ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চারটি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে এবং দুটি মামলা অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে। মামলা চারটি হচ্ছে, টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল (টিএফআই সেল), জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি), মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুমের মামলা ও ছাত্রদল-জাসাসের দুই নেতাকে ক্রসফায়ার দেওয়ার মামলা। প্রসকিউশনের জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যে টিএফআই সেলে নিয়ে গুম, জেআইসি সেলে নিয়ে গুম ও জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ-এই তিন মামলার রায় আসতে পারে। টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট আসামি ১৭ জন। অন্যদিকে জেআইসি সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।
টিএফআই সেল : এ সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জন আসামি। এর মধ্যে ১০ জন গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন-ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই আসামিদের প্রথম সাতজন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসাবে এবং শেষের তিনজন র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ সাত আসামি পলাতক। ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। ১৪ জুন এই মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গণীর মৃত্যু ও আরেক আইনজীবী অসুস্থ থাকায় সময় আবেদন করে আসামিপক্ষ। তা মঞ্জুর করে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
জেআইসি : এ সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ আসামি গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক ৩ পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামি পলাতক। ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এই মামলায় ১৮ জুন ষষ্ঠ সাক্ষী হিসাবে জবানবন্দি দেন হেফাজতে ইসলামের কর্মী তাজুল ইসলাম। এক সময় মানিকগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় কর্মরত ছিলেন তিনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জুলুম-নির্যাতনসহ হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে গণহত্যা নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করতেন। এ কারণে ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর রাতে মানিকগঞ্জের মাদ্রাসাটি থেকে তাকে গুম করা হয়।
মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান : ১৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।এই মামলায় ২২ জুন জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসাবে জবানবন্দি দেন ইমরুল কায়েস। তিনি বর্তমানে রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসাবে কর্মরত। পরে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
ছাত্রদল-জাসাসের দুই নেতাকে ক্রসফায়ার : ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ক্রসফায়ারের শিকার হন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা। এ মামলায় চার আসামি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) একেএম এহসানউল্লাহ পলাতক। অপর দুই আসামি বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
কল্যাণপুরে জাহাজ বাড়িতে ‘জঙ্গি নাটক সাজিয়ে’ ৯ তরুণকে হত্যা : ২৯ জানুয়ারি ২০১৬ সালে ঢাকার কল্যাণপুরে জাহাজ বাড়িতে ‘জঙ্গি নাটক সাজিয়ে’ ৯ তরুণকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে। এতে শেখ হাসিনাসহ আটজনকে আসামি করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে শেখ হাসিনা ছাড়া অপর আসামিদের মধ্যে আছেন-সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম প্রমুখ।
পাতারটেক এলাকায় কথিত ‘জঙ্গি আস্তানা’ নাটক সাজিয়ে সাতজনকে হত্যা : ২০১৬ সালে গাজীপুরের পাতারটেক এলাকায় কথিত ‘জঙ্গি আস্তানা’ নাটক সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সাবেক কর্মকর্তাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে আলোচিত এ ঘটনায় প্রথমবারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এ মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন-ডিএমপির সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তৎকালীন প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া।
১২ মে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম, ক্রসফায়ার ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ৩ হাজার ২৯৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনটি পৃথক আবেদন করে বিএনপি। বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামকে এসব বিষয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে দলটি। চিফ প্রসিকিউটরের কাছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সালাহ উদ্দিন খান এই আবেদনগুলো জমা দেন। তিনি দলটির মামলা, গুম, খুন ও তথ্য সংরক্ষক সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করছেন। আবেদনের পাশাপাশি ঘটনার প্রয়োজনীয় নথিপত্রও পুনরায় দাখিল করে বিএনপি। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা গুরুত্বের সঙ্গে গুম, ক্রসফায়ার ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এদিকে গুম হওয়া শত শত পরিবার অভিযোগ দিয়ে তদন্ত ও বিচারের আশায় তাকিয়ে আছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দিকে। তারা তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন দপ্তরে খোঁজ নিচ্ছেন। এমনকি আশাহত হয়ে কেউ কেউ ক্ষোভও প্রকাশ করছেন। প্রসিকিউশন বা তদন্ত সংস্থা গুমের অভিযোগ তদন্ত ও বিচার নিয়ে কতটুকু কাজ করতে পেরেছে, এ বিষয়ে তরফ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।জানতে চাইলে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী বলেন, গুমের মামলাগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একজন সাক্ষীকে ১৭ জন আসামির আইনজীবীকে জেরা করতে হচ্ছে। এতে করে সময় লাগছে। তিনি বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষকে জেরার জন্য যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন। প্রসিকিউশনের তরফ থেকে কোনো গাফিলতি আমি দেখছি না। কবে নাগাদ রায়গুলো আসতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন,এটা সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে আশা করছি চলতি বছরের মধ্যে এই মামলাগুলোর বিচার নিষ্পত্তি হবে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক (কো-অর্ডিনেটর) আনসার উদ্দিন খান পাঠান মঙ্গলবার বলেন, ইতোমধ্যে ৬-৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। আমাদের যখন বলা হয়, তখন আমরা সাক্ষী হাজির করি। আর কতজনের সাক্ষ্য দিতে পারেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা বলা কঠিন, প্রসিকিউশনের ওপর নির্ভর করে কতজন সাক্ষ্য দেবেন। জানতে চাইলে রাষ্ট্রনিযুক্ত শেখ হাসিনার আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, গুম-খুনের মামলায় এ পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষে অনেকেই সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে গুমের সব ঘটনা সঠিক নয়।