উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকার বদ্ধপরিকর
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যদিও কাজটি এক মাস বা এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবুও সরকার ধাপে ধাপে এটি অর্জনের পথে রয়েছে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত ল্যাব প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক।এ বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শনিবার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত চিকিৎসক ও কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চিকিৎসা পেশার গুরুত্ব যে কোনো পেশার চেয়ে বেশি এবং বর্তমান সরকার সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকরা রোগ-শোকে কাতর মানুষের পরম বন্ধু এবং বিপদের প্রকৃত সঙ্গী। একজন চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তাই পেশাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি মানবিক মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠা চিকিৎসকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।’
বর্তমান সরকার ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা জনগণের কাছে স্বাস্থ্যনীতির রূপরেখা তুলে ধরেছিলাম। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ বা প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। আমরা যদি রোগের শুরুতেই রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পারি তাহলে রোগের বিস্তার মোকাবিলা সম্ভব। আমাদের এই নীতি বাস্তবায়নে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে উপযুক্ত সচেতনতা সৃষ্টি করার পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে প্রণীত ‘যৌথ ঘোষণা’ বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কারণে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ যেমন শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক, হৃদরোগ ইত্যাদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে উপজেলা পর্যায়েই গুরুত্ব সহকারে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং নিয়মিত করা প্রয়োজন। জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করার ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি জরুরি।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে ইউএইচএফপিও অর্থাৎ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। মানসম্মত চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কাজে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং সদস্যরা প্রথমসারির যোদ্ধা। হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট এবং হেলথ কেয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্টের একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
তিনি বলেন, একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নিজ নিজ কর্মস্থলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার কাজটিও সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে হয়। কারণ, হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট এবং হেলথ কেয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট এ দুটি বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং সমউন্নয়ন না হলে স্বাস্থ্যসেবায় কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।
দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিএনপি সরকারের বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।’
‘আজকের স্বাস্থ্যসেবা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ’ আমেরিকার বিখ্যাত পুষ্টিবিদ প্রয়াত ‘জ্যাক লালেন’র উক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এ কারণেই যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস-এনএইচএস’র জেনারেল প্র্যাকটিশনার-জিপির আদলে প্রতিটি উপজেলা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করার চিন্তা রয়েছে।’
‘এই স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটগুলোতে দায়িত্ব পালনের জন্য বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে সারা দেশে ১ লাখ ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই হেলথ কেয়ারারদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী। হেলথ কেয়ারাররা মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে জনগণকে প্রাথমিক হেলথ কেয়ার দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন’ উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভবিষ্যতের স্বার্থে যে কোনো মূল্যে আমাদের মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পরিপূর্ণ মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করতে হবে।’
সারা দেশে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত দুই সরকারের ‘জীবনবিনাশী ব্যর্থতা’ ক্ষমাহীন অপরাধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, ভবিষ্যতে আর কখনোই যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার সারা দেশে জরুরিভিত্তিতে হামের টিকা দিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ায় আল্লাহর রহমতে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এজন্য আমি চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। যারা তাদের প্রিয় সন্তান হারিয়েছেন সেই সব বাবা-মাকে এবং স্বজনদের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে।’
উপজেলা পর্যায়ের ৬ জন চিকিৎসক ডা. শোভন কুমার বশাখ, ডা. মনজুর আল মোর্শেদ চৌধুরী, ডা. মজিবুর রহমান, ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী, ডা. সুমন কান্তি সাহা এবং ডা. তানসিভ জুবায়ের নাদিমকে কর্মদক্ষতার জন্য ক্রেস্ট প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এমএ মুহিত, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বক্তৃতা করেন।