দুর্নীতিবাজদের পোয়াবারো হতাশ সাধারণ মানুষ ,দুদক অধ্যাদেশ বাতিল
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:সবকিছু মিলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় কার্যত দুর্নীতিবাজদের পোয়াবারো এবং চরমভাবে হতাশ হয়েছে সাধারণ মানুষ।নিজেদের অনুগত,মেরুদণ্ডহীন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যাদের কমিটমেন্ট নেই-এমন লোকদের নিয়োগ দিতেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ বাতিল করেছে সরকার।দুদক সংস্কার কমিশনের সদস্য আহমেদ আতাউল হাকিম বলেন, অধ্যাদেশটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই কারও ভালো লাগবে না। বিভিন্ন সেক্টরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা ও সুপারিশগুলো দিয়েছিলাম। এখন বাতিলের সিদ্ধান্ত অবশ্যই দুর্ভাগ্যের। তিনি বলেন, এটি বাতিল না করে কোনো বিষয়ে সরকারের দ্বিমত থাকলে তারা কনটেস্ট করুক, আমরা জবাব দেব। তারা আমাদের সঙ্গে বসুক, আমরা সব সময় আলোচনার জন্য প্রস্তুত আছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবলে আগে তো দেশের স্বার্থ দেখতে হবে, দলের স্বার্থ দেখলে তো হবে না। কোনো দল তো চিরদিন ক্ষমতায় থাকবে না। আগে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তারা তো চিরদিন থাকতে পারেননি। সেজন্য যারা ক্ষমতায় যায়, তাদের বোঝা উচিত যে, এটা তাদের স্থায়ী জায়গা না।এর ফলে একদিকে দুর্নীতিবাজদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে,অপরদিকে ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির জায়গা সংকুচিত হয়েছে।এ অবস্থায় এই অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে রূপ দিতে সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত। দুদক অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ায় কাছে এভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন কয়েকজন আইনজ্ঞ।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আইনমন্ত্রী। দুদকসহ জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে সমালোচনা অব্যাহত আছে। এরপর রোববার সংবাদ সম্মেলন করে এর ব্যাখ্যা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। আইনমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি। কারণ, সেগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। তিনি বলেন,কিছু মহল এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। বলা হচ্ছে সরকার এসব অধ্যাদেশ বাদ দিয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগ ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন,সরকার স্পষ্ট করে বলছে, বিএনপি তার নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুসারে এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে আরও যুগোপযোগী করে আইনে রূপ দেবে। এটি নিয়ে বিতর্কের কোনো কারণ নেই।
১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করার পর ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন দুদকের তিন সদস্যের কমিশন। এরপর প্রায় দেড় মাস হতে চলেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি এখনো কমিশনশূন্য।
অধ্যাদেশে যা আছে : অধ্যাদেশটির মাধ্যমে দুদকের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করে মামলা দায়ের, তদন্ত ও অনুসন্ধানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। দুদক কোনো জেলায় অফিস স্থাপন করলে সেখানে বিশেষ আদালত গঠনের কথা বলা হয়েছে। দেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের দুর্নীতির পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের দুর্নীতিকেও আনা হয়েছে আইনের আওতায়। বাড়ানো হয়েছে দুদকের নিয়োগে বাছাই কমিটির পরিধি ও ক্ষমতা। এছাড়াও কমিশনের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি, বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল এবং সংসদীয় কমিটিতে রিপোর্ট পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতেই করা হয়েছিল দুদক অধ্যাদেশ। কারণ, জুলাই সনদে দুদকের নিয়োগের ব্যাপারে পরিষ্কার একটি দিকনির্দেশনা রয়েছে। সেখানে বলা আছে-দুদকের নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। বাছাই কমিটির চেয়ারম্যান হবেন আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। এছাড়াও থাকবেন সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় সংসদের সংসদনেতার (প্রধানমন্ত্রী) একজন প্রতিনিধি, বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিনিধি এবং প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি। তবে জুলাই সনদের এ ধারায় নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) দিয়েছে বিএনপি। ফলে ওই সময়েই ইঙ্গিত মিলেছে বিএনপি দুদককে নিজেদের মতো করে সাজাবে। জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন লিপু বলেন,সরকার নতুন করে আইন করার কথা বললেও আমার মনে হচ্ছে তারা করবে না। তারা দুদকের কোনো সংস্কার চায় না। সংস্কারের ইচ্ছা থাকলে আইন করে সেটিকেই সংস্কার করা যেত। দুদক সংস্কার কমিশনের অধ্যাদেশটিই যখন পাশ করল না, তখন নতুন করে আইন করার কথা বলায় বোঝা যাচ্ছে, তাদের আন্তরিকতা নেই। এটিকে পুরোপুরি বাতিলের মানসিকতা থেকেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, এ সরকার চায় না, দুর্নীতি দমন হোক।দুর্নীতি দূর করার বিষয়ে সরকার আন্তরিক না।তিনি বলেন, আগের সরকারের মতো, এরাও চায় দুর্নীতি করতে, টাকা পাচার করতে। দুদকের আইনে নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি তদন্ত কমিটি করার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত সেটিও হয়নি।
বর্তমানে দুদক যে আইনের আওতায় কাজ করছে সেটি হলো ‘দুদক আইন ২০০৪’। ওই আইনে ২০১৩ সালে ৩২(ক) ধারা যোগ করেন তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার। ধারাটিতে বলা হয়েছে, বিচারক বা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো আদালত মামলা নিতে পারবে না। এই একটি ধারাই দুদকের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা অনেক খর্ব করেছিল।
জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড.ইফতেখারুজ্জামান সোমবার বলেন,বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিলসহ সরকার ইতোমধ্যে যা করেছে, তা একধরনের টালবাহানা এবং হতাশাব্যঞ্জক।সরকারের মৌলিক জবাবদিহির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বিলীন করেছে।তিনি বলেন,এ ধরনের কাজ সরকারের উচিত হয়নি। এটা তাদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না,এমনকি তাদের নিজস্ব অঙ্গীকারেরও পরিপন্থি। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের করা দুদক অধ্যাদেশে অনেক ঘাটতি আছে। ইচ্ছাকৃতভাবেই সেটাকে দুর্বল করা হয়েছে। তারপরও সেখানে ভালো কিছু উপাদান ছিল। এটি স্থগিত করা এবং পরবর্তী সময়ে আলোচনা সাপেক্ষে ঢেলে সাজানো হবে বলে সরকারি দলের পক্ষ থেকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেটিকে স্বাগত জানাই।তবে তাদের নিজস্ব যে অঙ্গীকার ছিল,সেটি যেন সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বিশেষ করে দুদক সংস্কার কমিশনের যে প্রস্তাবনাগুলো সম্পর্কে তারা একমত হয়েছিল, সেগুলোর যেন প্রতিফলন ঘটে।
জানতে চাইলে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম সোমবার বলেন,অধ্যাদেশ বাতিল হলেও এই অধ্যাদেশের অধীনে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আইনের বিধানে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বাতিল হবে না। ওই বিধান বলবৎ থাকবে। সংশোধিত বিধান পরিবর্তন করতে হলে আগে নতুনভাবে আইন করতে হবে।সেই আইনের মাধ্যমে সংশোধিত বিধান পরিবর্তন করতে হবে। কারণ, এ ব্যাপারে আপিল বিভাগের একটি রায় আছে। শুধু বাংলাদেশ না,ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টেরও এ ব্যাপারে একটি রায় আছে।তবে তিনি আশাভঙ্গের কথাও বলেন। দেশের সরকারগুলো নিজেদের অনুগত,মেরুদণ্ডহীন,দুর্নীতির বিরুদ্ধে যাদের কমিটমেন্ট নেই-এমন লোকদের দুদকে নিয়োগ দিতে চায়। এতে দুর্নীতিবাজরা সুযোগ পেয়ে যান। তিনি বলেন, ক্ষমতাবানদের জবাবহিদির জায়গা সুনিশ্চিত করার জন্যই দুদক সংক্রান্ত অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরিত করা উচিত ছিল।