১৬ বছরে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে সীমাহীন লুটপাটে - Alokitobarta
আজ : শুক্রবার, ১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৬ বছরে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে সীমাহীন লুটপাটে


মু . এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া :বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো অতিমূল্যায়িত ছিল এবং সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই বাস্তবায়িত হওয়ায় সাধারণ মানুষ এর সুফল পাচ্ছে না। বরং লুটপাটের মাধ্যমে লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও এর ভেতরে বেশকিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠেছে।অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। শুধু প্রবৃদ্ধি নয় বরং টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। ব?্যাংকিং খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

শুক্রবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিন সকালে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।

অর্থমন্ত্রী বলেন-অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, হুন্ডি ও অর্থ পাচারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বিগত সময়ে ঋণ ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ সালে সুদ পরিশোধে ব্যয় ছিল মাত্র ৮৫ বিলিয়ন টাকা, যা ২০২৩-২৪ সালে ১৩ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১১৪৭ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অধিক নির্ভরতা বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য ঋণ প্রাপ্তি কঠিন করে তুলেছে, যাকে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়। ২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও ২০২৩-২৪ সালে তা নেতিবাচক ছিল।

শুধু প্রবৃদ্ধি নয় বরং টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা সরকারের লক্ষ্য-এমন দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন ও নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজে হাত দিয়েছি। নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটের কাছে জনগণের যে বিপুল প্রত্যাশা সে সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ সচেতন। অন্যদিকে জনগণও উত্তরাধিকার হিসাবে পাওয়া বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমাদের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখবেন এটাও আমরা আশা করি। বাজেটে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সহনীয় রাখতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অতিরিক্ত বাজেট সহযোগিতা পেতে উদ্যোগ গ্রহণের কথা তুলে ধরেন তিনি।

শুরুতেই অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে বিএনপি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে। সেই সঙ্গে দেশের উন্নয়নে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ দায়বদ্ধতা থেকেই ২০০৫-০৬ অর্থবছর, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার একটি চিত্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

তিন আমলের তিন অর্থবছরের তুলনামূলক চিত্র : অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। পরবর্তীতে ভুল নীতির কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে এবং কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতে নিয়োজিত হচ্ছে, যা ছদ্ম বেকারত্বকে তীব্রতর করেছে। সেই সঙ্গে তরুণদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করেছে। বর্তমানে কৃষি খাত মোট কর্মসংস্থানের ৪১ শতাংশ দখল করলেও জাতীয় মূল্যে এর অবদান মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতা ও কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধি বা ‘জবলেস গ্রোথ’র ঝুঁকি নির্দেশ করে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ভারসাম্যও নষ্ট হয়েছে। ২০০৫-০৬ সালে জাতীয় সঞ্চয় ছিল ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে কমে ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে, ২০০৫-০৬ সালে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৬৭ দশমিক ২ টাকা থাকলেও ২০২৪-২৫ সালে তা ১২১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রা সরবরাহ ও রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধিও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ সালে ৬.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। যা ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও বিনিয়োগ মন্থরতার বহিঃপ্রকাশ। রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি এবং রাজস্ব ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে সরকারের সম্পদ আহরণ সক্ষমতা সীমিত থেকেছে। বাজেট ঘাটতি ২০০৫-০৬ সালের ২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ০৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ : আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিচ্ছে, ঘাটতি অর্থায়নের বিকল্প ও সহজ শর্তের বৈদেশিক উৎস ও অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার উন্নয়ন গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। ঘাটতি অর্থায়ন ও এর উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ ও ঋণের ঝুঁকি হ্রাসের দিকে নজর দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব খাত থেকে অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণনির্ভরতা হ্রাস করা এবং জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমিয়ে আনা। সরকার আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

মূলধন গঠনে গুরুত্ব পাচ্ছে পুঁজিবাজার : অর্থমন্ত্রী বলেন, মূলধন গঠনে ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তে পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে স্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; যা বাস্তবায়নে উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হচ্ছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসিকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া হবে, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ড চালু করে পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক করা হবে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ভোগ ও রাজস্বের স্বাভাবিক চক্রকে সচল করার মাধ্যমে আমাদের সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করবে।

বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানিতে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এজন্য বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে সরকারকে চলতি অর্থবছরের মার্চে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, এলএনজিতে নির্ধারিত ভর্তুকির চেয়ে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এটি একদিকে যেমন সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর সম্ভাবনার দিকে যাবে; অন্যদিকে সমপরিমাণ প্রায় তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলবে।

Top