একদিনে ২৩ বিল পাশ জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনসহ
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসনসহ গণ-অভ্যুত্থানের মর্ম ও আদর্শকে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এবং এ সংক্রান্ত ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বিলটি উত্থাপন করা হয়।শুক্রবার জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান।ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বিলটি কণ্ঠ ভোটে পাশ হয়।জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিতে পাশ হয়েছে।
বিলটি পাশের ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো সংসদ অধিবেশন কক্ষ দীর্ঘস্থায়ী করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে ও টেবিল চাপড়িয়ে এই ‘ঐতিহাসিক’ পদক্ষেপকে স্বাগত জানান। মাইক ছাড়াই অনেকে এটিকে ‘বিপ্লবের আইনি স্বীকৃতি’ হিসাবে অভিহিত করেন। এ সময় সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের ১৭ জুন ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। ইতোমধ্যে কার্যকর হওয়া সেই অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাশের মাধ্যমে স্থায়ী আইনে পরিণত হলো।
বিরোধিতার মুখে সংসদে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন বিল’ পাশ : কোটি কোটি আমানতকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর লক্ষ্যে বহুল আলোচিত ‘ব্যাংক রেজল্যুশন বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করেন। পরে এটি কণ্ঠ ভোটে পাশ হয়। তবে এর আগে বিলটির ওপর বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সাইফুল ইসলাম মিলন জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়ে এর কঠোর সমালোচনা করেন।
বিলের বিরোধিতা করে সাইফুল ইসলাম মিলন বলেন, এই বিলের মাধ্যমে কোটি মানুষের আমানতের সুরক্ষাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। অতীতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ব্যাংক বাঁচানো হয়েছে, যা ছিল সাধারণ করদাতার টাকা। এই বিলটি পাশ হলে লুণ্ঠনকারীরা আইনি ফাঁক দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, আগে নিয়ম ছিল ব্যাংক ডুবলে শেয়ারহোল্ডাররা আগে ক্ষতি বহন করবেন এবং আমানতকারীরা সুরক্ষিত থাকবেন। কিন্তু নতুন আইনি কাঠামোয় সেই চেইন অব কমান্ড ব্যাহত হতে পারে। ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে বেনামি মালিকানার মাধ্যমে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা মোকাবিলায় আগের কঠোর আইনি কাঠামো বজায় রাখা জরুরি ছিল।
জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন-এই তিনটিই বর্তমান সরকারের মূল নীতি। আমরা আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বাস্তবতা বুঝতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার ব্যাংক খাতে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। আরও প্রায় এক লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণ সময়ে কোনো সরকারের পক্ষে এত বিশাল পরিমাণ অর্থ বহন করা সম্ভব নয়। এই বিলের মাধ্যমে একটি ‘নিউ উইন্ডো’ বা নতুন সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি বিকল্প ব্যবস্থা। এর ফলে শুধু লিকুইডেশনের ওপর নির্ভর না করে বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে মূলধন পুনর্গঠনের সুযোগ থাকবে।
আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’ পাশ, বিমার সীমা এখন ২ লাখ টাকা : আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংসদে ‘আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’ পাশ হয়েছে। ‘ব্যাংক আমানত বিমা আইন, ২০০০’ রহিত করে আর্থিক খাতে আস্থা বৃদ্ধি ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আরও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে এই বিলটি আনা হয়। বিলে আমানত বিমার সীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে। প্রতি আমানতকারীর জন্য এক লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে এই আইনের আওতায় আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত বীমা সুরক্ষা পাবেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি পাশের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাশ হয়। পাশ হওয়া বিলের বিধান অনুযায়ী, এক্ষেত্রে দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে, যাতে দ্রুত অর্থ প্রদান নিশ্চিত করা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান অবসায়নের নির্দেশ জারি হলে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে লিকুইডেটরকে আমানতকারীদের তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরবর্তী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সুরক্ষিত আমানতের অর্থ পরিশোধ করবে।
বিলে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকে আমানত সুরক্ষা তহবিল (ব্যাংক কোম্পানি) ও আমানত সুরক্ষা তহবিল (ফাইন্যান্স কোম্পানি) নামে দুটি পৃথক তহবিল গঠন করা হবে। এই তহবিল পরস্পরের থেকে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য দায় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই এই তহবিলগুলোর ট্রাস্টি বোর্ড হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে।
গভর্নরের বয়সসীমা তুলে দিয়ে বিল পাশ : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে বয়সসীমা ৬৭ বছর নির্ধারণের বিধান বাতিল করে একটি বিল জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করেন। পরে এ বিষয়ে কোনো দফাওয়ারি সংশোধনী না থাকায় বিলটি অপরিবর্তিত অবস্থায় পাশ হয়। নতুন আইনের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন আইন, ২০২৬’। বিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদের চার বছরের মেয়াদ ও পুনর্নিয়োগের সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে। তবে ৬৭ বছর পূর্ণ হলে পদে থাকা যাবে না বলে যে শর্ত ছিল, সেটি বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ১০ অনুচ্ছেদের ৫ দফায় থাকা শর্ত বিলুপ্ত হবে। এর অর্থ গভর্নর পদে চার বছরের মেয়াদ এবং পুনর্নিয়োগের বিধান থাকবে, কিন্তু বয়স ৬৭ বছর পার হলে পদ ছাড়তে হবে-এমন বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। এটি ছাড়াও আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো-সংক্রান্ত আরও কয়েকটি বিল এই অধিবেশনে নিষ্পত্তি হয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬ পাশ : ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ রহিত করে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বিলটি উত্থাপন করলে এটি কণ্ঠভোটে পাশ হয়।
জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল-২০২৬ পাশ : সংসদে ‘জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল-২০২৬’ পাশ হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বিলটি উত্থাপন করেন। পরে এটি কণ্ঠভোটে পাশ হয়।