শুটার দুই পুলিশের মৃত্যুদণ্ড
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠা রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন এবং অপর ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর ট্রাইব্যুনালের সদস্য হিসাবে বহুলপ্রত্যাশিত এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে এ মামলায় ৩০ আসামির সবাই দণ্ডিত হয়েছেন। রায়ের পটভূমিতে আবু সাঈদকে গুলি করার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আবু সাঈদ ভেবেছিলেন সামনে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, অথচ তারা (পুলিশ) ছিল অমানুষ।
রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছেন, আপিল করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। রায়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি আবু সাঈদের পরিবার। রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তারা গণমাধ্যমে অসন্তোষের কথা বলেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন : এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনই গ্রেফতার। এ দুজনই ঘটনাস্থলে আবু সাঈদকে হত্যার উদ্দেশ্যে সরাসরি গুলি করে। রায়ের পর খুনি আমির হোসেন জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বলেন, আমি সরকারের গোলামি করেছি।
যাবজ্জীবন সাজা তিন কর্মকর্তার : রংপুর কোতোয়ালি জোনের তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং এসআই বিভূতিভূষণ রায় ওরফে মাধব। যাবজ্জীবন সাজা ভোগের পাশাপাশি পৃথক ধারায় এ তিনজনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলায় আসামি ৩০ : রায়ে সবাই দণ্ডিত হয়েছেন। মৃত্যদণ্ড দুই এবং যাবজ্জীবন তিনজন ছাড়া বাকি ২৫ আসামির মধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারসহ ৫ জনের ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আটজনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১১ জনের হয়েছে তিন বছরের সাজা। অপর একজনের হাজতবাসের সময়কে দণ্ড হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। দণ্ডিতদের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে ছয়জন কারাগারে আছেন। রায় ঘোষণার সময় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
পেছনে ফেরা : ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। সেদিন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও সংবাদমাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। পরদিন থেকে সারা দেশে ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে নতুন কর্মসূচি শুরু হয় ছাত্রদের। বিক্ষোভে দমন-পীড়ন আর সহিংসতার মধ্যে ১৯ জুলাই কারফিউ দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি শেখ হাসিনার সরকার। তুমুল গণ-আন্দোলনের মধ্যে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।
বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা উপলক্ষ্যে দুপুর ১২টার দিকে বন্দি ছয় আসামি-এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজকে তোলা হয় কাঠগড়ায়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়। এজলাসে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার শুরুতে চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আবু সাঈদ জুলাই গণ-আন্দোলনের প্রথম শহীদ। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। ভেবেছিলেন তার সামনে যারা ছিল, তারা সবাই মানুষ। ভেবেছিলেন তার কিছু হবে না। কিন্তু তারা মানুষ ছিল না। তারা অমানুষ হয়ে গিয়েছিল। ৬ আসামির উপস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত রায় পড়েন বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালে হট্টগোল শুরু করেন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা। ট্রাইব্যুনাল থেকে বের হওয়ার সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করেন। এ সময় সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বলেন, ‘আমরা এ রায় মানি না। আমাদের ফাঁসানো হয়েছে, আমরা নির্দোষ।
যে ২৫ আসামি বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পেলেন : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি পলাতক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি গ্রেফতার আছেন। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডলকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা দুজনই পলাতক। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেলকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমানকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে রাফিউল গ্রেফতার আছেন। হাফিজুর রহমান পলাতক। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সেকশন অফিসার (পলাতক) মো. মনিরুজ্জামান পলাশকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডলকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, সাবেক নিরাপত্তা প্রহরী নুর আলম মিয়াকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, সাবেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মাহাবুবার রহমানকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সাবেক এমএলএসএস একেএম আমির হোসেনকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা পলাতক। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজকেও দোষী সাব্যস্ত করে রায়ে বলা হয়েছে, তার হাজতবাসের সময়কে সাজার মেয়াদ গণ্য করে দণ্ডাদেশ প্রদান করা হলো। রায়ে রংপুর মহানগর পুলিশের (আরপিএমপি) সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকে (পলাতক) ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, পলতক আরপিএমপির সাবেক উপকমিশনার মো. আবু মারুফ হোসেনকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শাহ নূর আলম পাটোয়ারীকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আসামি পলাতক চিকিৎসক মো. সরোয়ার হোসেনকে (চন্দন) পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে (পলাতক) ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মাহাফুজুর রহমান, সহসভাপতি মো. ফজলে রাব্বি, সহসভাপতি মো. আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ও দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেনকে তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই পলাতক। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদুল হাসানকে (পলাতক) পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি কারাগারে আছেন।
আমি সরকারি চাকরি করি, আমি হুকুমের গোলাম : মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনার পর রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে বলেন, ‘আমি পুলিশের চাকরি করি, হুকুমের গোলাম। আমাকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমি তাই করেছি। আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমি এ রায় মানি না।
রায়ে অসন্তোষ আসামিপক্ষের আইনজীবীর : আসামি আনোয়ার পারভেজ, এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের পক্ষে লড়েছেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। রায় ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে। আপিলে নতুনভাবে তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি সংগ্রহের জন্য এরই মধ্যে আবেদন করা হয়েছে।
২৫ জন সাক্ষ্য দেন : এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং পুলিশ সদস্য রয়েছেন। আবু সাঈদের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিরা এবং পটভূমির সাক্ষী হিসাবে বর্তমান সংসদ-সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ আদালতে সাক্ষ্য দেন। এছাড়া ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ভিডিও এবং টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের ভিডিও প্রমাণ হিসাবে দাখিল করা হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর আপিলের সিদ্ধান্ত : রায় ঘোষণার পর ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আবু সাঈদের ওপর গুলির ঘটনা ভিডিও ধারণকারী সাংবাদিকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এই জুলাই বিপ্লবের সময় সাংবাদিকরা জীবনবাজি রেখে কাজ করেছেন। রায় নিয়ে সন্তুষ্ট কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দুজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তিনজনের যাবজ্জীবন হয়েছে। আর আমাদের যে ধরনের চার্জ ছিল, তাদের ভূমিকা অনুযায়ী সাজাগুলো হয়েছে বলে মনে হয়। তারপরও আমরা পূর্ণাঙ্গ জাজমেন্ট পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে যদি মনে হয় যেসব চার্জ থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকবে। সেগুলো পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়া সাপেক্ষে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। সন্তুষ্ট বলতে আমরা তো ৩০ জনকে আসামি করেছিলাম। ৩০ জনকেই দণ্ডিত করা হয়েছে। কেউ কিন্তু এ মামলায় খালাস পাননি।
এক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল বলেন, এখানে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির জায়গা থেকে আগেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল, পুলিশের আইজিপির আরেকটি মামলায় শাস্তি হয়েছে। এই কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি কিন্তু সারা দেশের সব ক্ষেত্রেই কাজ করেছে।
ব্রিফিংয়ে উপস্থিত আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, রায় নিয়ে আপনারা সন্তুষ্ট কি না-জবাবে তিনি বলেন, ওখানে দুজনের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন হয়েছে। আমরা পূর্ণাঙ্গ জাজমেন্ট পাওয়ার পর সেটি পর্যালোচনা করে যদি আমাদের কাছে মনে হয়, যেসব চার্জ থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আপিল করব।