কেরানীগঞ্জে শনিবার গ্যাস লাইটার কারখানায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে
মু.এ বি সিদ্দীক ভুঁইয়া:কেরানীগঞ্জে শনিবার গ্যাস লাইটার কারখানায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন এক শিশু ও দুই নারীসহ ৫ শ্রমিক। ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিট সাড়ে ৩ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নেভায়। বেঁচে ফেরা শ্রমিকদের অভিযোগ, আগুন লাগার পর কারখানা মালিকের ছেলে ও দারোয়ান তাদের বের হয়ে আসতে বাধা দেয়। ঘটনার পরপরই কারখানা মালিক পালিয়েছে। পুলিশ তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছে।এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়ীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শনিবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, নিহত ও আহতদের পরিবারের দায়িত্ব সরকার নেবে। নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে ২ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলো জনবহুল এলাকা থেকে সরানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কেরানীগঞ্জের কদমতলীর ‘ডিপজল গলি’। নামটা শুনলে মনে হতে পারে কোনো সিনেমার লোকেশন। কিন্তু শনিবার দুপুরের পর এই গলিটি পরিণত হয় এক নরককুণ্ডে। দুপুর সোয়া ১টার দিকে আকরাম গ্যাস লাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের লেলিহান শিখা যখন গ্যাস লাইটার কারখানাটিকে গিলে খাচ্ছিল, তখন ভেতরে চলছিল বাঁচার আকুতি। কিন্তু লোহার গেট আর মালিকপক্ষের ‘বের হতে বাধা’ দেওয়ার নিষ্ঠুর আদেশে সেই আকুতি পরিণত হয়েছে নীরবতায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টার যমদূতসম আগুনের তাণ্ডব শেষে যখন ধ্বংসস্তূপ সরায় ফায়ার সার্ভিস, তখন মিলল পাঁচটি মানুষের শরীর। শরীরগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে, তাৎক্ষণিক লিঙ্গ নির্ধারণ করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ সময় উপস্থিত শত শত মানুষের চোখের পানিও যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে দগ্ধ পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই নারী বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে শুধু একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এ ছাড়া দুইজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম (দোলন) বিষণ্ন কণ্ঠে জানান, লাশগুলো পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। ভেতরে আরও কেউ আছে কিনা, তল্লাশি করে দেখা হয়েছে। তিনি জানান, দুপুর ১টা ১১ মিনিটে এই আগুনের খবর পাওয়া যায়। সাতটি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে বিকাল ৪টা ৪৪ মিনিটে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়।এদিকে নাম ও পরিচয় শনাক্ত হওয়া ওই নারী হলেন মিম আক্তার পাখি। তার বাবার নাম দেলোয়ার হোসেন। তিনি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা লন্ডনি হাউস এলাকায় থাকতেন। এই অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে দুজন শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে মো. জিসান ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছেন। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, আগুনে জিসানের শরীরের ২২ শতাংশ পুড়ে গেছে। আর মো. আসিফ নামে এক কিশোর শ্রমিক জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। আসিফের ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান জানিয়েছেন।
আগুন লাগার পর থেকেই লাইটার কারখানার বাইরে ছিল এক অন্যরকম হাহাকার। কুলসুম বেগম নামে এক মা পাগলের মতো চিৎকার করছিলেন। তার ১৭ বছরের ছেলে নাঈম তিন মাস আগে এই কারখানায় কাজে ঢুকেছিল। সকালেই হাসিমুখে বেরিয়ে আসা নাঈম এখন নিখোঁজ। কুলসুম বেগম বলছিলেন, আমরা গোলামবাজার এলাকায় থাকি। ছেলেটা সকালে কাজে বের হইল। এখন আগুনের খবর পাইয়া আইসা দেহি কারখানা শেষ। আমার নাঈম কই? আমি কার কাছে যামু? একই চিত্র কাওসার সরদারের। তার মেয়ের বয়স মাত্র ১২, নাম মনিরা। এই ছোট্ট শিশুটি এক বছর ধরে এই বিষাক্ত কারখানায় কাজ করছিল। কাওসার সরদার নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন পুলিশের পিকআপ ভ্যানের দিকে। যেখানে বডি ব্যাগে ভরে লাশগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল মিডফোর্ট হাসপাতাল মর্গে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৩৫ থেকে ৪০ জন শ্রমিক কাজ করতেন এই কারখানায়। তাদের মতে, এই কারখানাটি ছিল একটি ‘মৃত্যুকূপ’। আবাসিক এলাকায় প্রায় ২০ শতক জায়গার ওপর টিনশেড আর দেয়াল দিয়ে ঘেরা ঘিঞ্জি পরিবেশের ভেতর আটটি গুদামে রাখা হতো দাহ্য গ্যাস লাইটারের কাঁচামাল। রমিজ মিয়া ও কামরুল ইসলাম নামে দুই বাসিন্দা জানান, আগুন লাগার পর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আশপাশের এলাকা কেঁপে উঠছিল। তারা জানান, প্রায় দুই বছর আগেও এই কারখানায় আগুন লেগেছিল। তখন প্রশাসন এটি বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু মাসখানেক পর রহস্যজনকভাবে পুনরায় চালু হয় এর কার্যক্রম। কোনো ধরনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই কীভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন কারখানা চলল, এ নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়। বরং এটি ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’।
কারখানা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা ১১ বছরের মিম এক রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। মিমের অভিযোগ, যখন আগুন লাগে, তখন মালিক আকরামের ছেলে আকতার এবং দারোয়ান শ্রমিকদের বের হতে বাধা দেন। তারা বলছিলেন, কিছু হবে না, ভেতরে থাকো। মিম জানায়, সে জোর করে দারোয়ানকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে আসায় আজ বেঁচে আছে। কিন্তু তার বাবা জাহিদ, মা এবং দাদি তিনজনই ওই কারখানায় ছিলেন। মিম এখন একা, তার কান্নায় কদমতলীর বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
ঘটনার পর থেকেই কারখানার মালিক আকরাম মিয়া ও তার ছেলে আকতার মিয়া পলাতক। জিনজিরা এলাকার বাসিন্দা এই মালিকের হদিস পাচ্ছে না পুলিশও। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা পাঁচটি লাশ মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছি। মালিককে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
ঢাকা বিভাগের ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক ছালেহ উদ্দিন জানান, কারখানায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা না থাকায় এবং মালিকপক্ষের গাফিলতির কারণেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লেগেছে।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফতাব আহমেদ জানান, নিহতদের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাফন-কাফন বাবদ প্রাথমিক ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর শোক : এই অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন,প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেরানীগঞ্জের গ্যাস লাইটার কারখানার অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি তদন্ত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন। শিবলী বলেন, তারেক রহমান স্থানীয় সংসদ-সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়,ঢাকা জেলার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি),পুলিশ সুপার (এসপি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকের সঙ্গেও ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেছেন ঘটনাটি তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে প্রধানমন্ত্রী ফোনালাপে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন।