আমরা এমন কাজ করতে চাই, যেখানে প্রত্যেকের আয় দুই-চার বছরে দ্বিগুণ হয়ে যায়
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই হচ্ছে বিএনপির রাজনীতি। আমরা এমন কাজ করতে চাই, যেখানে প্রত্যেকের আয় দুই-চার বছরে দ্বিগুণ হয়ে যায়। তিনি বলেন, এই খাল খননের মাধ্যমে সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যে বাংলাদেশে মানুষ তার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। যে বাংলাদেশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। আমরা সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।পরে বিকালে প্রধানমন্ত্রী দিনাজপুর গোর-এর শহীদ ময়দানেসোমবার দুপুরে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়া গ্রামে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে এদিন দেশের ৫৩ স্থানে আনুষ্ঠানিকভাবে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সুধী সমাবেশ ও ইফতার মাহফিলে যোগ দেন। সেখানে তিনি বলেন, আগামী মাসের মধ্যেই কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হবে।
কৃষির উন্নয়ন, সেচব্যবস্থা ও গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসাবে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী ও রঘুনাথপুরে নিজ হাতে খাল খনন করেন। উলাশী ও রঘুনাথপুর গ্রামের মুখ থেকে শুরু হয়ে যদুনাথপুর গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ওই খালটির খনন শুরু করেছিলেন তিনি। খালটি এখনো ‘জিয়া খাল’ নামে পরিচিত। পরের বছর দিনাজপুরের সাহাপাড়া থেকে ‘দেশব্যাপী স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কাটা কর্মসূচি’ চালু হয়। এটি ছিল তার ‘সবুজ বিপ্লব’-এর অংশ, যা জলাবদ্ধতা নিরসন এবং অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এর প্রায় ৪৯ বছর পর তার ছেলে তারেক রহমান তেমনি কর্মসূচি হাতে নিলেন।সোমবার খাল খননের সূচনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল। বক্তৃতা করেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বাবলু, জাতীয় সংসদের হুইপ আক্তারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ-সদস্য মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু, দিনাজপুর-২ আসনের সংসদ-সদস্য সাদিক রিয়াজ পিনাক, দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ-সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, কাহারোল উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা বাদশা ও ৬নং রামচন্দ্রপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ারুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহম্মেদ কচি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, কৃষক ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। সেজন্যই আমরা বলেছিলাম, আমরা কৃষকের পাশে দাঁড়াতে চাই। এজন্য নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথমেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
সরকারপ্রধান বলেন, আমরা এমন একটি দল করি, যেই দলের কাজ হচ্ছে, সেগুলো করা যা করলে মানুষের উপকার হয়। যে কাজগুলো করলে মানুষ খুশি হবে। সেই কারণেই আজ আমরা একত্রিত হয়েছি। এই সাহাপাড়া খালটি পুনর্খননের কাজ শুরু করেছি। এই খালটি প্রায় ১২ কিলোমিটার লম্বা। যখন কাজ শেষ করতে পারব তখন ৩১ হাজার কৃষক এখান থেকে পানি নিয়ে ১২শ হেক্টর জমিতে সেচ দিতে পারবে। সাড়ে তিন লাখ মানুষ এই খালের পানির সুবিধা পাবে। এ এলাকায় এখন যা ফসল উৎপাদন হচ্ছে তার থেকে প্রায় ৬০ হাজার টন বেশি হবে। সারা দেশের কৃষকদের উপকারে আগামী ৫ বছরে দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে।
কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ বিরাট দেশ। ২০ কোটি মানুষের বসবাস এ দেশে। এত মানুষের জন্য খাবার-দাবার বিদেশ থেকে কি আনা সম্ভব? এই খাবার আমাদের এই দেশেই উৎপাদন করতে হবে। বিশেষ করে ধান-চালসহ মৌলিক খাবারগুলো এই দেশে উৎপাদন করতে হবে। আমাদের দেশের মাটি উর্বর। শুধু খাল নয়, খালের দুইপাশে ৬০ হাজার বৃক্ষরোপণ করা হবে। খালের দুই পাশে চলাচলের জন্য রাস্তা করে দেওয়া হবে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালে পানি না থাকায় আমাদের গভীর নলকূপের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে পানি তুলতে হয়। ১০ বছর আগে যতটুকু গভীরতায় পানি পাওয়া যেত, এখন আরও বেশি গভীরতা প্রয়োজন হয়। পানি কমে গেলে আমাদের সবাইকে বিপদে পড়তে হবে। এজন্য মাটির ওপরের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য মাটির গভীরের পানি রেখে দেওয়া যায়। খাল-নদী খনন করে আমাদের সেই পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনি ওয়াদায় আমরা ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম। আমরা এরই মধ্যে সেই কাজটি শুরু করেছি। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এরই মধ্যে ৩৭ হাজার মা-বোনের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। অল্প সময়ের মধ্যে রংপুর অঞ্চলের সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারপরও আমরা যে ওয়াদা করেছিলাম সেই কাজগুলো শুরু করেছি। কৃষক ভাইদের জন্য যেভাবে সুদ মওকুফ করেছি, মা-বোনদের ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছি, একইভাবে কৃষক ভাইদের কৃষি কার্ড পৌঁছে দেব, যা আগামী মাস থেকে চালু হবে। ক্ষুদ্র-প্রান্তিক ও মধ্যম চাষিদের কাছে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। যাতে করে এই কার্ডের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন। বিএনপি সরকার হচ্ছে কৃষকের বন্ধু।
তারেক রহমান বলেন, উত্তরাঞ্চল হচ্ছে কৃষিপ্রধান এলাকা। এই অঞ্চলের যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য অনেক কোম্পানি কৃষিনির্ভর মিল-কারখানা করেছে। আমরা এরই মধ্যে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, এই এলাকায় আরও কী কী কৃষিনির্ভর মিল-কারখানা গড়ে তোলা যায়। যাতে এখানকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।
আগামী মাসের মধ্যেই কৃষক কার্ড : বিকালে দিনাজপুর গোর-এর শহীদ ময়দানে সুধী সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, আমাদের সরকার গঠনের এক মাস হতে আরও দুদিন বাকি আছে। নির্বাচনের আগে আমরা যেসব ওয়াদা করেছিলাম, সেসব ওয়াদা পূরণে ইতোমধ্যেই আমরা কাজ শুরু করেছি। খাল খনন কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড চালু, ধর্মীয় নেতাদের ভাতা চালু করেছি। আগামী মাসের মধ্যেই কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত অনেক বছর মানুষের যেসব প্রত্যাশা ছিল দেশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, সেটি হয়নি। কাজেই আপনাদের সবার কাছে আমি অনুরোধ করব-দেশটি আমাদের, এই দেশটিকে যদি গড়তে হয় তাহলে আমাদের সবাইকেই পরিশ্রম করতে হবে। আরেকটি কাজ আছে, সেটি হচ্ছে আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। আমরা যদি অস্থির হয়ে যাই, ১৫-১৬ বছর যে কাজগুলো হয়নি, আমরা হয়তো এক মাস বা ১৫ মাসে সে কাজগুলো করতে পারব না। যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো সমাধান করতেও সময়ের প্রয়োজন। আপনারা এই সরকারকে নির্বাচিত করেছেন। এই সরকার মানুষের জন্য কাজ করতে চায়, দেশের জন্য কাজ করতে চায়। আপনাদের যদি সহযোগিতা থাকে, এই সরকার রাত-দিন সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে সুধী সমাবেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এজেডএম জাহিদ হোসেন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আসাদুল হাবিব দুলু, ফরহাদ আজাদ বাবলু, আক্তারুজ্জামান মিয়া, মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু, সাদিক রিয়াজ পিনাক, সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ইফতার শেষে মাঠেই মাগরিবের নামাজ আদায় করেন তারেক রহমান। এরপর শহরের শেখ ফরিদ গোরস্তানে নানা, নানি, খালাসহ নিকটাত্মীয়দের কবর জিয়ারত করেন তিনি। রাতেই তিনি সড়কপথে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে গিয়ে আকাশপথে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন।