দক্ষতার ঘাটতিতে পিছিয়ে তরুণদের কর্মসংস্থান,বিপুল টাকা বিনিয়োগেও সুফল নেই - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দক্ষতার ঘাটতিতে পিছিয়ে তরুণদের কর্মসংস্থান,বিপুল টাকা বিনিয়োগেও সুফল নেই


মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।যে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে-অনেক ক্ষেত্রে তার উপযোগী দক্ষ জনবলও পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বিদেশের শ্রমবাজারে যাচ্ছে বিপুলসংখ্যক স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী। ফলে বেশি কাজ করলেও উঁচুমানের বেতন পাওয়া যাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি বিপুল অর্থ ব্যয় কতটা কার্যকর-সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। দেশে বেকারদের ৭৬ শতাংশ তরুণ। আবার উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশকে চাকরির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে মোট বেকার ২৬ লাখ ২৪ হাজার জন। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ-তরুণী ২০ লাখ ৩২ হাজার জন। আবার বেকারদের প্রায় ২৯ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী। এ হিসাবে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার জন। প্রতি তিনজন স্নাতক ডিগ্রিধারীর একজন বেকার! শুধু বেকার নয়, চাকরি পাওয়ার অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে। বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৭ শতাংশের বেশি বেকার যুবককে এক থেকে তিন মাস বেকার থাকতে হয়। দুই বছরের বেশি কাজ খুঁজতে হয় ৮ শতাংশ বেকারকে। উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় আরও বেশি। চাকরিপ্রত্যাশী ১৭ শতাংশের বেশি স্নাতক দুই বছরের বেশি বেকার থাকেন। এক বছর থেকে দুই বছর বেকার থাকেন ১৫ শতাংশের বেশি উচ্চশিক্ষিত তরুণ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় প্রতি তিনজনের একজনকে এক বছরের বেশি চাকরির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার তীব্রতাও বেড়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা বলছে, বিডিজবস ডটকমে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ চাকরিপ্রত্যাশীর প্রোফাইল রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই লাখ চাকরিপ্রার্থী এ প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে নিজেদের পছন্দের চাকরি খোঁজেন। দুই বছর আগে এ সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লাখ। অর্থাৎ এ সময়ে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৩ শতাংশের বেশি। প্ল্যাটফর্মটিতে সব সময় ছয় থেকে সাত হাজার নতুন চাকরির খোঁজ থাকে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মাসে প্রায় ১০ হাজার নতুন চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়। এরপরও একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জনের বেশি চাকরিপ্রার্থী আবেদন করছেন। কোভিড মহামারির আগের পাঁচ বছরে এ ধরনের একটি পদের জন্য গড়ে ১৭৩ জন আবেদন করতেন। অর্থাৎ একই ধরনের চাকরিতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ।

বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী বলেন, শুধু ঋণ সুবিধা দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়। বর্তমানে বিদ্যমান পদের বিপরীতে নিয়োগ কম এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হারে বাড়ছে। ফলে বেকারত্ব বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতা বেশি হচ্ছে এবং চাকরি পেতে অধিক সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।দেশের পাশাপাশি বিদেশের শ্রমবাজারেও দক্ষতার ঘাটতির চিত্র স্পষ্ট। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। তাদের মাত্র ৪ শতাংশ পেশাজীবী এবং ২২ শতাংশ দক্ষ কর্মী। বাকি ৭৪ শতাংশ স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী। ২০২৪ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে দক্ষ ছিলেন ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং পেশাজীবী ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে এ হার ছিল যথাক্রমে ২৪ ও ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন,গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কিন্তু আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। এর প্রধান কারণ অদক্ষ শ্রমিক পাঠানো। ভারত, ফিলিপাইন ও নেপাল কম খরচে দক্ষ শ্রমিক পাঠাচ্ছে এবং আয়ও বেশি করছে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষতা উন্নয়নে সরকারের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিগত সরকারের সময়ে উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু যুব বেকারত্ব মোকাবিলায় নেওয়া এসব প্রকল্পের বেশির ভাগই টেকসই কর্মসংস্থান বা আয়ের সুযোগ তৈরিতে সফল হয়নি।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকাশিত এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নেওয়া প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর দুর্বল পরিকল্পনা, ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ ও ফলোআপের ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। ‘অনগ্রসর ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্পে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত চার জেলায় ৫ হাজার ১৮৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে ৩৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়। প্রকল্পটির আওতায় ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেওয়া ২ হাজার ৫৪৫ জনের মধ্যে মাত্র ৭২ জন বা ২ দশমিক ৮২ শতাংশ তিন বছরে এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কম্পিউটার ও আইটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া ২ হাজার ৬৪০ জনের মধ্যে মাত্র ১২১ জন বা ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ এ খাতে চাকরি পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৬০ শতাংশ কিছু আয় করতে পারলেও ৩৩ শতাংশ পুরোপুরি বেকার। আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্পটির কাঠামো ও বাস্তবায়নকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলা হয়েছে। একই ধরনের ব্যর্থতার উদাহরণ রয়েছে অন্যসব প্রকল্পেও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন,প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মূল দুর্বলতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরের ধাপে।গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে.মুজেরী বলেন,শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না।প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা কর্মক্ষেত্রে সেই জ্ঞান কতটা কাজে লাগাতে পারছেন, সেটিই আসল প্রশ্ন। আইসিটি বা কারিগরি যে কোনো প্রশিক্ষণ বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ না পেলে তা ফলপ্রসূ হয় না। তিনি আরও বলেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ঋণ সুবিধা, কর্মসংস্থানের লিংকেজ, বাজারে সংযোগ ও নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ না থাকলে প্রশিক্ষণ সার্টিফিকেটেই সীমাবদ্ধ থাকে।

Top