রাষ্ট্রপতি অস্তিত্বহীন অধিবেশন ডাকতে পারেন না
নুর নবী জনী :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব সংবিধানে নেই। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭২ অনুসারে প্রধানমন্ত্রীও এ অধিবেশন ডাকতে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না। তিনি আরও বলেন, সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে এবং ইনশাআল্লাহ আমরা সংবিধান মেনেই এ পর্যন্ত এসেছি এবং সংবিধান মেনে চলব। সামনের দিনগুলোয়ও আমরা সাংবিধানিকভাবেই রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাব। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে এসব কথা বলেন।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছি যে, জুলাই জাতীয় সনদ ঐতিহাসিকভাবে যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসাবে তার প্রতিটি শব্দকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে আরোপিত কোনো আদেশ দিয়ে বা কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না, সেটা একটা বিশাল আইনি প্রশ্ন এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে অনির্ধারিত বিতর্ক হয়। প্রশ্নোত্তরপর্ব শেষে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এ নিয়ে বক্তব্য দিলে আলোচনা শুরু হয়। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সরকারি দল থেকে বক্তব্য চান।এরপর বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শুরুতে তিনি স্পিকারের কাছে প্রশ্ন রাখেন-কোন বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতাকে ফ্লোর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মুলতুবি প্রস্তাব আনতে হয়, সেটার জন্য বিধি আছে। সেই বিধিতে কোনো নোটিশ তিনি দিয়েছেন কি না। যদি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে হয়, সেই বিষয়ে বিধি ৬৮ অনুসারে কোনো নোটিশ দিয়েছেন কি না।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদের অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ধারা পরিবর্তন হবে বা সংবিধান পরিবর্তন হবে, এ রকম কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। সেটা জায়েজ নয়। তিনি বলেন, কিন্তু এই যে আদেশ (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ), এই আদেশটা না অধ্যাদেশ, না আইন। মাঝামাঝি জিনিস। সেদিন আমি বলেছিলাম, এটা হয়তো নিউট্রাল জেন্ডার হতে পারে। এই আদেশটিকে ‘আরোপিত’ আদেশ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দুটি কাজ বাদে সবকিছু প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করে থাকেন। একইভাবে এই সংসদের আহ্বানও তিনি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। কিন্তু সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও সেটা রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও সেই অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না বিধায় তা করেননি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন যদি বিরোধী দলের প্রশ্ন অনুসারে রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশটা সাংবিধানিক হয়, সেটা নিয়ে এখানে আলোচনা হতে পারে। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ, এটা এবং গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট অংশ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না মর্মে আদালত রুল জারি করেছেন। এখানে হয়তো বিচার বিভাগ মতামত দেবে। কিন্তু তাদের মতামত এই সার্বভৌম সংসদের ওপর কখনো বাইন্ডিং (বাধ্যতামূলক) না। কিন্তু সার্বভৌম সংসদ আবার এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যেটা জুডিশিয়ারিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাবে বা ভায়োলেশন অব কনস্টিটিউশন হয়ে যাবে। সুতরাং উভয়দিকে লক্ষ রেখে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে যেতে হবে।
বিরোধীদলীয় সংসদ-সদস্যদের পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার বিষয়টিকে ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তারা (বিরোধী দল) এমন একটি পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবি জানাচ্ছেন, যার কোনো বৈধ ভিত্তি নেই। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, রাষ্ট্র ইমোশন (আবেগ) দিয়ে চলে না; রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে, আইন দিয়ে, কানুন দিয়ে। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে; কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে, আইনগতভাবে দিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংবিধানের যে কোনো পরিবর্তন বা সংশোধন অবশ্যই সঠিক আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংসদে উত্থাপন ও পাশ হতে হবে। কোনো বেআইনি বা আরোপিত আদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন সম্ভব কি না, তা একটি বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন।
চলমান অধিবেশনে ১৩৩টি ঝুলে থাকা অধ্যাদেশ নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকায় এখনই সংবিধান সংশোধনী বিল আনা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে আগামী বাজেট অধিবেশনে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কার্য-উপদেষ্টা কমিটি চাইলে একটি কমিটি গঠন এবং সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই মহান সংসদে সেই বিল গ্রহণ করব। এ পর্যন্ত আমরা সংবিধান মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছি এবং ভবিষ্যতেও সাংবিধানিক পথেই এগোব।সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছি, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসাবে তার প্রতিটি শব্দকে সম্মান করব। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে আরোপিত কোনো আদেশ দিয়ে, কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না, সেটা একটা বিশাল আইনি প্রশ্ন, সাংবিধানিক প্রশ্ন। তিনি সেটা নিয়েও বিতর্ক ও আলোচনার আহ্বান জানান।
গণভোটের চারটি প্রশ্নে নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সেই গণভোট এই আইন অনুসারে, সেই রায় অনুসারে সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে, সংবিধানের সংশোধন আসতে হবে। সংবিধানে যদি সেটা আমরা গ্রহণ করি, তারপরে সেই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। তখন সংবিধান যদি এটা কনটেইন করে, ধারণ করার পর তখন যদি পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নিতে হয়, সেটা তখনকার ব্যাপার হবে। আমরা এটা নিয়ে বিতর্ক করতে পারি। তবে সংবিধান সংশোধনের জন্য আমরা এই সেশনে বিল আনতে পারব কি না, সেটা যথেষ্ট সন্দেহ আছে।পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আপনি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন দ্য স্পট সলিউশন দেওয়া যায় না। এটার জন্য আপনি নোটিশ দেবেন। নোটিশ পাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত দেব।এর আগে সংসদে প্রবেশের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানে সংস্কার পরিষদ নামে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ বাস্তবায়ন করতে হলে আগে সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে।স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের দলের প্রাথমিক সদস্যপদ এখনো বহাল রয়েছে। তারা দল ত্যাগ করেননি। তাই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এখানে প্রযোজ্য নয়। এই অনুচ্ছেদ তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন কেউ দল ত্যাগ করবে।