দেশের অর্থনীতির অবস্থা কিছুটা খারাপ, তবে তা একেবারেই খাদের কিনারে এসে পৌঁছেনি
মোহাম্মাদ নাসির উদ্দিন:দেশের অর্থনীতির অবস্থা কিছুটা খারাপ, তবে তা একেবারেই খাদের কিনারে এসে পৌঁছেনি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। ঋণের টাকা পাচার হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আগামী রাজনৈতিক সরকারের জন্য আমরা কিছু ফুটপ্রিন্ট রেখে যেতে চাই। যাতে তারা সংস্কার কাজ চলমান রাখে। আর আমাদের সংস্কারগুলো তারা চলমান না রাখলে আবারও তাদের টেনে নামাতে হবে। রোববার রাজধানীর গুলশান ক্লাবে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।ড. সালেহউদ্দিন আরও বলেন, চাহিদায় লাগাম টানতে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানি পণ্যের শুল্ককর কমানো হয়েছে। তবে শুল্ক ছাড় দেওয়া হলেও চিনি ছাড়া অন্য পণ্যের দাম কমেনি। তাই মূল্যস্ফীতি কমানো যাচ্ছে না। এখন মুদ্রা বিনিময় হার স্বাভাবিক আছে। ক্রলিং পেগের কারণে আগের মতো ওঠানামা নেই। মূল্যস্ফীতিতে চাঁদাবাজি ভূমিকা রাখছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সমঝোতা খুব কঠিন। তবে চাঁদাবাজির সমঝোতা সহজ। প্রতিটি মার্কেটে দুই-তিন ধরনের চাঁদাবাজ আছে। যারা আগের সরকারের মদদপুষ্ট ছিল এবং পরবর্তী সরকার হিসাবে যারা আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের সঙ্গেও আছে। আরেক গ্রুপ স্থানীয় মাস্তান। ট্রাক ছুঁয়ে তারা ৫০০ টাকা নিয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থেকে ৫ লাখ টাকার এক ট্রাক পেঁয়াজ মধ্যরাতেই ৭ লাখ টাকায় বিক্রি করছে। আমরা এসব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্প রিভিউ করা হচ্ছে। অর্ধেক কাজ হয়েছে-এমন প্রকল্পগুলোয় নজর দেওয়া হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি বড় প্রকল্প। এটি থাকবে। আসন্ন বাজেট নিয়ে সরকার কাজ শুরু করেছে জানিয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, বাজেটে খুব বেশি নাটকীয় কিছু করা হবে না। তবে করছাড় কমাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রণোদনার দিন শেষ। এটা ভবিষ্যতে করা সম্ভব হবে না। আমরা কি কর রেয়াত দিতেই থাকব-এটা সম্ভব না। সবাইকে যুক্তিসংগত কর দিতে হবে।
পুঁজিবাজারে ‘কারসাজির’ জন্য বাংলাদেশের ক্রিকেট অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে আরও দুই বছর আগেই জরিমানা করা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন অর্থ উপদেষ্টা।আইবিএফবি সভাপতি হুমায়ন রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউএসএইডের মিশন ডিরেক্টর রিড জে এশলিম্যান। সম্মেলন বক্তা ছিলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একদিকে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের রূপরেখা চাচ্ছে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচন দেওয়ার কথা বলছে। এ সরকারের সাফল্যের পুরোটা নির্ভর করবে মানুষকে কতখানি অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে পারবে তার ওপর। মানুষকে অর্থনৈতিক স্বস্তি দেওয়া না গেলে, নিরাপত্তা সুরক্ষা দিতে না পারলে সংস্কারের জন্য যত ভালোবাসাই থাকুক না কেন তাতে মানুষের ধৈর্য থাকবে না।
ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, দুই বছরে তিন শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর ভেতরে ৬৮ জন সংসদ-সদস্যের আত্মীয়স্বজন, স্ত্রী ও মেয়ের নামে নেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে মানবসম্পদ পাঠানোর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু তারা মুনাফা নিয়েছে। তিনি বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর খরচ হিসাবে কেবল ২ বিলিয়ন ডলার হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, ইতিহাস থেকে যিনি শিক্ষা নিতে পারেন না, তার চেয়ে বড় গর্দভ আর কেউ নেই। আশা করছি, ড. ইউনূস, ড. সালেহউদ্দিন ও ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো বিচক্ষণ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে। রিড জে এশলিম্যান বলেন, অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলে উদ্বেগ বাড়ে। এক্ষেত্রে আইনের শাসন জরুরি। আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। ৫-৬ মাসে বাংলাদেশে পরিবর্তন এসেছে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইউএসএইডের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।