দেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর অন্যতম স্বাস্থ্য খাত।দুর্নীতিবাজরা অধরাই থেকে যায় - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
২৯৮ তম পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের লড়াইয়ের গল্প গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরাই.......অঙ্গীকার হওয়া উচিত পায়রা বন্দরের সঙ্গে সড়ক ও রেলের কানেকটিভিটি বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ মেট্রোরেলের ভাড়ার ওপর ভ্যাট নেওয়ার সিদ্ধান্ত অগ্রহণযোগ্য চাকরির পেছনে ছুটে না বেড়িয়ে চাকরি দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করুন বরিশাল বিমানবন্দর এরিয়া ভাঙ্গন রোধে কাজ করছে সরকার বিআরটিসির অগ্রযাত্রায় সাহসিক পদক্ষেপ,সাফল্যের মহাসড়কে অদম্য যাত্রা জুজুৎসুর নিউটনের যৌন নিপীড়নের ভয়ংকর তথ্য লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে বিদ্যুৎ খাতকে বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে তৃতীয় শ্রেণি সরকারি কর্মচারী সমিতি

দেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর অন্যতম স্বাস্থ্য খাত।দুর্নীতিবাজরা অধরাই থেকে যায়


আলোকিত বার্তা:দেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর অন্যতম স্বাস্থ্য খাত। তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সর্বত্রই যেন দুর্নীতির প্রতিযোগিতা।মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের কেনাকাটা, নিয়োগ, পদায়ন, বদলিসহ এমন কোনো কাজ নেই যেখানে দুর্নীতি হয় না। এসব দুর্নীতির নেতৃত্বে এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ঠিকাদারদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সিন্ডিকেট।সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির অনেক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্নীতির মূলোৎপাটন হয় না কখনই। সবসময়ই দুর্নীতির অভিযোগে ধরা পড়েন দু’একজন চুনোপুঁটি। ঠিকাদারসহ দুর্নীতির রাঘব-বোয়ালরা শত অনিয়ম করেও সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে ভালো যোগাযোগ থাকায়।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের আবজাল হোসেন নামে এক কেরানির হাজার কোটি টাকার সন্ধান পেয়েছে দুদক। কিন্তু সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য খাতে এমন অসংখ্য আবজাল ঘাপটি মেরে আছে। তাদের দুর্নীতির বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে না কেউ। রয়েছে আবজালের মতো দুর্নীতিবাজ সৃষ্টিকারী কর্মকর্তা ও ঠিকাদারও। যারা বছরের পর বছর দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষকে ঠকিয়ে নিজেরা হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে যাচ্ছে। তারা আরও বলেন, ন্যায়পরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ঠিকাদারসহ তাদের সিন্ডিকেটের ভয়ে সবসময় তটস্থ থাকেন।সংশ্লিষ্টরা জানান,আবজালের বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে এমন আরও অনেক দুর্নীতিবাজের তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। এমনকি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পেয়েছে দুদক। এদের মধ্যে দু’জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, দু’জন পরিচালক ও উপপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন।

এছাড়া এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়িচালকও রয়েছেন এই সিন্ডিকেটে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, সিএমএসডি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট, নার্সিং অধিদফতর ছাড়াও প্রতিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, স্বাস্থ্য বিভাগীয় অফিস, সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ সব স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে তাদের সরব পদচারণা।
গত ৯ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদফতরের কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি আত্মসাতের অভিযোগ আনে দুদক। এরা হলেন- স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রাক্তন পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন, পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা ও জনশক্তি উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. আবদুর রশিদ, সহকারী পরিচালক (বাজেট) ডা. আনিছুর রহমান। এই তিনজনকে ১৪ জানুয়ারি তলব করা হয়েছিল দুদক কার্যালয়ে। ২০১৫ সালে দুদক থেকে স্বাস্থ্য খাতের কয়েক কর্মকর্তার নথি চাওয়া হয়। তারা হলেন- উপসচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব আবদুল মালেক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল কাফী ও সুলতান মাহমুদ।

এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতি রোধে সংস্থাটির ২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছিল দুদক। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ জনকে বদলি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে তাদের সহকর্মীরা যুগান্তরকে বলেন, দুর্নীতিগ্রস্তদের বদলি করে কি তাদের শাস্তি দেয়া হল নাকি দুর্নীতি অব্যাহত রাখার সুযোগ দেয়া হল, সেটিই বোধগম্য নয়। কেননা দুর্নীতিবাজ সবসময় সর্বস্থানেই দুর্নীতিবাজ। এর আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত উন্নয়ন কর্মসূচিতে এক বছরে (২০১১-১২ অর্থবছরে) ১৫১ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ আনে দুদক। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- অবকাঠামো নির্মাণ, চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়, গবেষণা ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, হেলথ এডুকেশন অ্যান্ড প্রমোশন কর্মসূচি, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, জাতীয় পুষ্টি কার্যক্রম। পরে অধ্যাপক খন্দকার সিফায়েত উল্লাহকে ওএসডি করার মধ্যেই থেমে যায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা আলোকিত বার্তাকে বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় দুর্নীতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা উপজেলা পর্যায় থেকে মন্ত্রণালয়ের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আর্র্থিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং বাড়ি-গাড়িসহ বিভিন্ন দামি উপহার দিয়ে তাদের দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত করেন। যখন দুর্নীতির বিষয় ধরা পড়ে তখন দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার থেকে যায় ঘটনার আড়ালে। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুকৌশলে সরিয়ে নেয়া হয়। সর্বোচ্চ শাস্তি পান তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা। তাও আবার বদলি, নয় তো সাময়িক বরখাস্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, এক আবজাল ধরা পড়লেও ওইরকম ডজন ডজন আবজাল স্বাস্থ্য খাত লুটেপুটে খাচ্ছে। এদের মধ্যে জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে একজন ২৫ বছর ধরে হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। আরেকজন অবৈধভাবে একাই অ্যাকাউনট্যান্ট ও স্টোর অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) হিসেবে রয়েছেন তিনজন- একজন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, একজন গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, আরেকজন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কমিউনিটি ক্লিনিক উচ্চমান সহকারী হিসেবে কোটিপতি হয়েছেন একজন, নাক-কান-গলা ইন্সটিটিউটে অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে আছেন আরেকজন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন অ্যাকাউন্টস অফিসার, একজন স্টোর অফিসার, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের উন্নয়ন কাজে সংযুক্ত একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্টাবলিশমেন্ট অব ফাইভ মেডিকেল কলেজ হসপিটাল প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মকর্তা।

দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটির স্বত্বাধিকারী বঙ্গবন্ধুর খুনি পরিবারের একজন সদস্য। টাকার বিনিময়ে দেশের মন্ত্রী-সচিবদের ম্যানেজ করে টানা ১০ বছর স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিতে একক রাজত্ব করছেন ওই ব্যক্তি। ওই প্রতিষ্ঠানের সহযোগী দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া আরও কমপক্ষে ১৫টি ঠিকাদারি ফার্মের নামে বিভিন্ন হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক পরিচালক আলোকিত বার্তাকে বলেন,বঙ্গবন্ধুর খুনি পরিবারের এক সদস্যের মালিকানাধীন ঠিকাদারের বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও জানাজানি হয়। কীভাবে বঙ্গবন্ধুর খুনি পুরিবারের একজন এসব করছে তাও জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু এই ঠিকাদার ও তার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট ছিল অপ্রতিরোধ্য। সেই সিন্ডিকেটেরই একজন আবজাল। বর্তমানে এমন কমপক্ষে অর্ধডজন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর খুনি পরিবারের এক সদস্যের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে যেসব হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে সেগুলোর যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত চেয়ে ২০১৬ সালে দুদক স্বাস্থ্য অধিদফতরের হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট শাখায় চিঠি দেয়। চাহিদা অনুযায়ী তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ না করায় ওই বছরই দ্বিতীয় দফায় আবারও চিঠি দেয় সংস্থাটি। তবে অজ্ঞাত কারণে সেই তদন্ত বেশিদূর এগোয়নি। দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হোসেন আলোকিত বার্তাকে বলেন, এর আগে কী হয়েছে সে বিষয়ে আমি কিছু বলব না। কিন্তু আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছি। যেখানেই দুর্নীতি পাওয়া যাবে, সেখানেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ আলোকিত বার্তাকে বলেন, এদের ওপরে নজর রাখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হেেয়ছে। বর্তমান মন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। বিভিন্ন দফতর ম্যানেজ করে যারা দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছে তারা আর বেশিদিন সুযোগ পাবে না।

Top
%d bloggers like this: