কঠিন চাপের মুখে মধ্যবিত্ত ,নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ৩রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
মেহেন্দিগঞ্জের পর এবার বাকেরগঞ্জে জামায়াতকর্মী সাজিয়ে ইসলামী আন্দোলনে যোগদানের নাটক বিচার শেষ হবে কবে ? মাদকের ৯৫ শতাংশ মামলা ঝুলে আছে কোন দলের প্রস্তুতি কেমন,ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপ শুরু ২১ জানুয়ারি ভারত থেকে আনা চালে ক্যানসারের বিষাক্ত উপাদান, বিতরণ স্থগিত বিরোধী দল সংলাপে এলে জুলাই সনদ নিয়ে নমনীয় হতে পারে সরকার জামায়াত জোটের ঢাকা-খুলনা কুষ্টিয়া লংমার্চ আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রী ব্যর্থ, পদত্যাগ দাবি করলেন নাহিদ এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল আজ অনৈতিক সুবিধার গ্রহণের অভিযোগে ২৮ জন পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড বাস্তবায়নে সক্ষমতা জরুরি,সমঝোতা-চুক্তি ইতিবাচক

কঠিন চাপের মুখে মধ্যবিত্ত ,নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন


মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই মন্দায় আক্রান্ত।আগামীতে এ সংকট কোন দিকে মোড় নেবে তা নির্ভর করছে যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর।বিশেষ করে মধ্যবিত্তের অবস্থা এখন সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে।বিভিন্ন খাতে খরচ কমিয়ে বাধ্য হয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান কমাতে হচ্ছে।তেলের দাম বাড়ানো হলেও ভোক্তার ওপর চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এ মন্দা আরও প্রকট হয়েছে। এতে একদিকে ভোক্তার আয় কমেছে,অন্যদিকে যুদ্ধের প্রভাবে পরিবহণ খচরসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।এতে কঠিন চাপের মুখে পড়েছে ভোক্তা।

এদিকে মার্চে যুদ্ধ, রোজা ও ঈদের প্রভাবে পণ্যমূল্য বাড়লেও সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, মার্চে মূল্যস্ফীতির হার কমেছে। তবে এখনো মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বাড়ার হার কম। মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে গড়ে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। ওই মাসে মজুরি বাড়ার হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ এখনো মূল্যস্ফীতির চেয়ে ভোক্তার আয়ের হার দশমিক ৬২ শতাংশ কম। এ ঘাটতি ভোক্তা ঋণ করে বা খরচ কমিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের মধ্যে পুষ্টিহীনতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষার হার ও মানও কমে যেতে পারে।

এদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহ সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান যেমন হচ্ছে না, তেমনি বিদ্যমান কর্মও ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আয় কমার পাশাপাশি বেকারত্বও বাড়ছে। যা মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও নিম্নমুখী করে তুলছে।বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বাড়ছে। সেই ব্যয়বৃদ্ধি সমস্যা হতো না, যদি একই হারে আয় বাড়ত। এক্ষেত্রে মানুষ টিকে থাকার জন্য সঞ্চয় ভেঙে অথবা ঋণ করে খাচ্ছে। কিন্তু যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাদের তো কোনো সঞ্চয় নেই। কিংবা কেউ ধারও দেন না। এ অবস্থায় তারা আরও খারাপ অবস্থায় আছেন।

সূত্র জানায়, গত মাসের ব্যবধানে ডলারের দাম এক টাকার বেশি বেড়েছে। এতে আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে আমদানি খরচ বাড়ায় আমদানি পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করেছে।এমন অবস্থায় বাজার হয়েছে ঊর্ধ্বমুখী। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলে সরকার রেশনিং আরোপ করেছে। এছাড়া সিন্ডিকেটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামে বাড়তি দামে তেল বিক্রি হচ্ছে। এতে ট্রাক ভাড়া আগের তুলনায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য পরিবহণ খাতেও খরচ বেড়েছে।

শনিবার রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকা। যা এক মাস আগেও ১৮০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪৩০-৪৪০ টাকা। যা এক মাস আগে ৩২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি। আগে ছিল ৭৫০ টাকা। এদিকে ভোজ্যতেলের বাজারেও চলছে অস্থিরতা। আরেক দফা মূল্য বাড়াতে বাজার থেকে উধাও হয়েছে বোতলজাত সয়াবিন তেল। পাশাপাশি সংকট দেখিয়ে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ২১০-২২০ টাকা। যা এক মাস আগে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বেড়েছে চিনির দামও। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকা। যা ঈদের আগে ১০০ টাকা ছিল।বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম রহমান বলেন,যুদ্ধের কারণে ভোজ্যতেল আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় বেড়েছে। তাই দেশের বাজারেও দাম বাড়াতে হবে।

খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৬-৫৮ টাকায়। বিআর-২৮ জাতের মাঝারি দানার চাল ৬৮ টাকা, সরু চালের মধ্যে মিনিকেট চাল ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। নতুন করে দাম না বাড়লেও প্রতি কেজি সরু মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা, মাঝারি দানার মসুর ডাল ১২০-১৩০ টাকা, মোটা দানার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়।

নয়াবাজারের ব্যবসায়ী মো. আকবর বলেন, পরিবহণ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সবজি থেকে শুরু করে সব পণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। জ্বালানি পরিস্থিতির জন্য পণ্যের দাম যেটুকু বাড়ার কথা তার তুলনায় বেশি দাম নেওয়ায় সাধারণ মানুষ বিড়ম্বনায় পড়েছেন।

এদিকে কেজিপ্রতি ৮০ টাকার নিচে মিলছে না কোনো সবজি। মাসের ব্যবধানে কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি। এক মাস আগে ছিল ৮০-৯০ টাকা। পটোল বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি। যা আগে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। করলা বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকা, বরবটি ৮০-৯০, ঢ্যাঁড়শ ৮০, চিচিঙ্গা ৮০-৯০, ধুন্দল ৬০-৮০, শিম ৮০-৯০, লাউ ৮০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব সবজির দাম ৩ দিন আগেও কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা কম ছিল। মূলত ট্রাক ভাড়া বাড়ার কারণে সবজির দাম বেড়েছে।

খুচরা বাজারে ২০০ টাকা কেজির নিচে মিলছে না কোনো মাছ। প্রতি কেজি পাঙাশ ২০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৩০ টাকা, রুই ৩৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০-৩০০ টাকা, দেশি টেংরা ৬০০ টাকা, বেলে ৩৫০ টাকা, চিংড়ি ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ টাকা, কই ৪০০-৫০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা, শোল ৭০০ টাকা ও টাকি ৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ যাতে অবৈধভাবে মুনাফা করতে না পারে সেজন্য আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. মাসুম বলেন, আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মাসে ৪০ হাজার টাকা বেতন পাই। মা-বাবা, স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে আমার সংসার। সেখান আমিসহ তাদের খাবার জোগাড় করতে মাসে ৫০ কেজির এক বস্তা চাল ৪ হাজার, ৫ লিটার তেল ৮৫০, বাসা ভাড়া ১২ হাজার, সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ তরকারি রান্নার উপকরণ কিনতে ৮ হাজার, গ্যাস সিলিন্ডার ২০০০, সাবান-ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পু ৫০০, মুদি বাজার আরও ২ হাজার, বিদ্যুৎ বিল ১০০০ ও মোবাইল টকটাইমে খরচ হয় ৫০০ টাকা। মা-বাবার হাতে ৫ হাজার টাকা দিলে সব মিলিয়ে খরচ হয় ৩৫ হাজার ৮৫০ টাকা। খরচ বহন করতে না পেরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি।
রান্নার গ্যাসের বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে। এপ্রিল মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকায় নির্ধারিত হয়েছে। তবে বাস্তবে বাজারে এই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে; অনেক ক্ষেত্রে ২ হাজার টাকার নিচে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে না।

ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির বলেন, তেল সংকটের কারণে সমস্যা হচ্ছে এটা নিয়ে লুকোচুরির কিছু নেই। ট্রাকে তেল নিতে এখন এক-দুই দিন সময় লাগে। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় একটি ট্রিপে দুই থেকে তিনবার তেল নিতে হয়। সে কারণে আগের তুলনায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে বগুড়া থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় আসতে ভাড়া ছিল ১২-১৪ হাজার টাকা। সেখানে এখন ১৮-২০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহণ ব্যয় বাড়ার প্রভাব সরাসরি পণ্যের দামে পড়ছে। পাশাপাশি বাজার সিন্ডিকেটের কারণে ভোজ্যতেলসহ একাধিক পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই বাজারে কঠোরভাবে তদারকি দরকার।

Top